‘কোচিং’ কি ইয়াবা?

সাম্য শরিফ : কোচিংবাজ’ ও ’কোচিং বাণিজ্য’ শব্দ দুটি এ সময়ে খুবই ব্যাপকভাবে সমালোচিত দুটি টার্ম। শিক্ষকদের বিপক্ষে ব্যবহৃত এই অপমানজনক ’কোচিংবাজ’ শব্দটা শিক্ষক শব্দের সাথে ট্যাগ হয়ে দুর্নীতিবাজ, ধান্দাবাজ, চালবাজ, ঠকবাজ এরুপ বিভিন্ন সামাজিকভাবে ঘৃন্য কাজে লিপ্ত মানুষদের সাথে স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের একাকার করে দিচ্ছে। বর্তমানে স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের এরুপ অপবাদে নিপতিত হওয়ার প্রধান কারণ কোচিং-এ নিয়োজিত এক ধরনের শিক্ষকদের বাণিজ্যিক মানষিকতা ও সে অনুযায়ী কর্মকান্ড। ডাক্তারদের জন্য রুগিরা যেভাবে উপার্জনের মাধ্যম, এই প্রকৃতির শিক্ষকেরা তাদের প্রতিষ্টানের শিক্ষার্থীদেরকেও সেভাবে উপার্জনের মাধ্যম মনে করেন। এ লক্ষ্যে এ ধরনের শিক্ষকেরা টাকার জন্য কোচিংকেন্দ্রিক কিছু অনৈতিক পদ্ধতি অবলম্বন করেন যা প্রকৃতপক্ষে অপরাধের শামিল।

অনেক শিক্ষক রয়েছেন যারা শিক্ষার্থীদেরকে তাদের কাছে প্রাইভেট পড়তে বা কোচিং করতে বিভিন্নভাবে বাধ্য করেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের কাছে না পড়লে পরীক্ষায় কম মার্কস দেওয়া হয়। আবার কোনো কোনো শিক্ষক পরীক্ষার আগে স্পেশাল ‘শটর্’ সাজেশন দিয়ে থাকেন। অন্য দিকে এরুপ শিক্ষকেরা ক্লাসের প্রতি অমনোযোগী ও উদাসীন থাকেন অথচ প্রাইভেট বা কোচিং ক্লাসে খুব আন্তরিকতার সাথে পড়ান। এসব কারণে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রায় সব শিক্ষার্থীই কোচিং করতে বা প্রাইভেট পড়তে বাধ্য হয়। অভিভাবকেরা শিক্ষকদের অনৈতিক এই সিষ্টেমে জিম্মি হয়ে তাদের সন্তানদেরকে কোচিং করাতে বাধ্য হন।
এ কাজগুলো যারা করেন তারা শিক্ষকতা পেশায় না এসে অন্য কিছু করলে তাদের সাথে সাথে পেশাটাও কলুষমুক্ত হতো। স্কুল-কলেজের অংক, ইংরেজি ও বিজ্ঞান বিষয়ের অধিকাংশ এবং অন্য দুই একটি বিষয়ের কতিপয় শিক্ষকের এরুপ কোচিং বা প্রাইভেট সংক্রামক হয়ে মহামারির আকার ধারণ করেছে। এরুপ শিক্ষকদের কাছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা এখন জিম্মি। এই জিম্মি দশার অবসান অবশ্যই হতে হবে। কিন্ত শিক্ষকদের এই ‘কোচিং বাণিজ্য’ বন্ধে দুটো বিষয় দেখা যাচ্ছে: একটি ‘জুতা আবিস্কার’-এর মত অবাস্তব পদ্ধতির প্রয়োগ এবং অন্যটি সারাদেশে কোচিং কেন্দ্রিক হুজুগ।

কোচিং বন্ধে বর্তমানে যে আইন বা পদ্ধতি বিদ্যমান রয়েছে তা অনেকটা বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ’জুতা আবিস্কার’ কবিতার হাস্যকর পদ্ধতির মত। এই কোচিং বন্ধের জন্য বহুমুখী পদক্ষেপের কোনো প্রয়োজন নেই। বিভিন্ন ধারা উপধারারও দরকার নেই। শিক্ষকদের এরুপ অপতৎপরতা বন্ধের জন্য শিক্ষামন্ত্রণালয়ের এক লাইনের একটি আইনইতো যথেষ্ট যে ‘স্কুল-কলেজের কোনো শিক্ষক তার প্রতিষ্টানের কোনো শিক্ষার্থীকে কোনোভাবেই প্রাইভেট পড়াতে বা কোচিং করাতে পারবেনা’।

কিন্তু এটার পরিবর্তে যা করা হয়েছে তাতো খাড়া-বড়ি থোড়, থোড়-বড়ি খাড়া। বিদ্যমান আইনে শিক্ষকরা অতিরিক্ত ক্লাসের নামে শিক্ষা প্রতিষ্টানেই কোচিং করাতে পারছেন। আগে প্রতিষ্টানের বাইরে কোচিং নামে পড়াতেন এখন ভিতরে ‘অতিরিক্ত ক্লাস’ নামে পড়াচ্ছেন। ‘কোচিং বাণিজ্য’ বন্ধ করতে হলে অবশ্যই নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদেরকে টাকার বিনিময়ে পড়ানো বন্ধে কঠোর আইন করতে হবে।কোনো শিক্ষক তার প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদেরকে প্রাইভেট পড়াতে না পারলে এই ’কোচিং বাণিজ্য’ অটোমেটিক বন্ধ হয়ে যাবে।

কিন্ত উপরেল্লিখিত নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদেরকে বাধ্য করা যে ’কোচিং বাণিজ্য’ ওটা ছাড়া সাধারণভাবে কেন কোচিং বা প্রাইভেটকে ক্ষতিকারক হিসেবে দেখা হবে? কেনইবা প্রতিষ্ঠানের বাইরে এটা নিষিদ্ধের চিন্তা করতে হবে। বরং এটার আরও প্রসার ঘটাতে হবে সহায়ক শিক্ষা হিসেবে শিক্ষার্থীদের অধিক শিক্ষালাভের সুযোগের জন্য। নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কাছে কোনো শিক্ষার্থী পড়তে বাধ্য না হলে ও পড়তে না পারলে এবং শিক্ষকরা তাদের প্রতিষ্ঠানের র শিক্ষার্থীদেরকে পড়াতে না পারলে স্কুল-কলেজের প্রাইভেট বা কোচিং-এর সাথে আর কোনো নেতিবাচক দিক থাকে না। কিন্তু একজন শিক্ষক যদি তার অফিস টাইম বা কর্মস্থলের নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে অন্য কোনো প্রতিষ্টানের শিক্ষার্থীদের পড়ান তাহলে দোষ বা ক্ষতির কি আছে? শিক্ষাতো ওজন বা গণনাযোগ্য সীমিত বস্ত না যে তিনি প্রতিষ্ঠানের বাইরে বিতরণ করতে পারবেন না।

আবার ডাক্তাররা অফিসের বা হাসপাতালের সময়ের বাইরে সকাল-বিকাল ব্যক্তিগত চেম্বারে বসতে পারলে শিক্ষকরা অফিস টাইমের বাইরে সকাল-বিকাল ব্যক্তিগতভাবে পড়াতে পারবেন না কোন যুক্তিতে? শুধুমাত্র নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পড়াতে পারবেন না স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাতিত্ব ও জবরদস্তিমূলক কয়েকটি সঙ্গত কারণে। এর বাইরে তিনি কেন কোচিং বা প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না যদি ডাক্তারদের কাছে রুগি আসার মত স্বেচ্ছায় কোনো শিক্ষার্থী তার কাছে পড়তে আসে? ডাক্তাররা চাকরিজীবি, শিক্ষকরাও চাকরিজীবি। আবার চিকিৎসা যেমন সেবা, শিক্ষাওতো সেবা। একটি দেহের; অন্যটি জ্ঞানের, তথ্যের ও মনোজগতের। এক দেশে দুই আইন থাকতে পারে কি? ভালো যে বিষয়টি এখনো আদালতে গড়ায়নি।

আবার কোচিং বন্ধে সারা দেশে শুরু হয়েছে এক হুজুগে মাতামাতি। ছাত্রজীবন যেন ভয়ঙ্কর ’কোচিং’-এর থাবায় ছিন্ন ভিন্ন হতে চলেছে। কোচিং-এর ভয়াল গ্রাসে যেন অচিরেই আমাদের শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জন মূর্খতার অতল গহবরে তলিয়ে যাবে। আর তাই শিক্ষাকে বাঁচাতে এখন কোচিং-কে ক্রাইম হিসেবে আখ্যায়িত করে এটা দমনে সবাই যেন সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে। আর এরুপ তৎপরতায় চারিপাশে শুধু বাহবা আর বাহবা। যেন সারা দেশে ’ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা’ এই কোচিং ঠেকাতে পারলেই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা রাহুমুক্ত হয়ে যাবে। কোনও কোনও পত্রিকা সারা দেশে কোচিং সেন্টারগুলোর জেলা ভিত্তিক তালিকা প্রকাশ করাও শুরু করেছে জাতিকে রসাতল থেকে রক্ষা করতে! হুজুগ যে আমাদের সংস্কৃতির একটা বড় অংশ তা এই কোচিং-প্রাইভেট বন্ধে সমস্বরে শাবাশ ধ্বনিতেও স্পষ্টভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। কোচিং-এর বিপক্ষে কথা বলাটাই যেন এখন সভ্যতা, দেশপ্রেম ও আধুনিকতার একটা ট্রেন্ড-এ পরিণত হয়েছে!

বাংলাদেশে এই মুহুর্তে শিক্ষিত যুবক রয়েছে যাদের একমাত্র বৈধ আয়ের উৎস এই কোচিং বা প্রাইভেট। কোচিং-এ বা প্রাইভেটে তারা কি করে? সেখানে তারা নির্দিষ্ট সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রীকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে পড়িয়ে থাকে। যারা পড়তে আসে তারাও সংশ্লিষ্ট বিষয় ভালোভাবে আয়ত্ব করার জন্য আসে। এসব কোচিং সেন্টারে সাধারণত অনার্স ও মাষ্টার্স পড়–য়া শিক্ষার্থীরা পড়িয়ে থাকে। কোনও চাকুরী পাওয়ার আগ পর্যন্ত বেকার থাকাকালীন তারা একমাত্র উপার্জনের এ কাজটি করে। এখানে দোষ এবং ক্ষতির কি আছে? কেউতো ’ছেলেধরা’ হয়ে কোচিং সেন্টারে শিক্ষার্থীদের ধরে আনে না। যারা পড়তে আসে তারাতো স্বেচ্ছায় এসব কোচিং সেন্টারে আসে কিছু শিখে পরীক্ষায় ভালো করার জন্য। আবার যারা শেখায় তারাওতো সর্বোচ্চ যতেœ পড়িয়ে থাকে তাদের নিজস্ব স্বার্থে। এই পড়ানো নিয়ে এত নিন্দা বর্ষন ও তালিকা প্রস্ততকরণের কি আছে? তালিকা অবশ্যই করা যেতে পারে। তবে তা হতে হবে ইতিবাচক। হতে পারে যে রেজিষ্ট্রেষনবিহীন কোনও কোচিং সেন্টার থাকবে না এবং কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে।
এই কোচিং-এর দুটো সামাজিক ইতিবাচক দিক খুবই স্পষ্ট। কোচিং সেন্টারগুলো টিকে থাকার স্বার্থেই শিক্ষার্থীদেরকে সর্বোচ্চ সেবা দেয়ার চেষ্টা করে থাকে। আর যাই হোক যে সময়টুকু একজন শিক্ষার্থী কোচিং সেন্টারে থাকে ওই সময়টুকু সে শিক্ষার সাথেই থাকে। এসব সেন্টারের মাধ্যমে পড়া, চর্চা ও নিয়মিত পরীক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট থাকার ফলে একজন শিক্ষার্থীর যেসব ঘাটতি থাকে তা অনেকটা পূরণ হয়ে যায়। এমনিতেই ইন্টারনেটের এই সময়ে অনেক শিক্ষার্থীই বই বিমুখ, সেখানে ক্লাস টাইমের বাইরে অবসর সময়ে কোচিং সেন্টারের সাথে সংশ্লিষ্টতা কিছুটা হলেও একজন শিক্ষার্থীর বই-এর সাথে সংশ্লিষ্টতা বাড়ায়।

আবার এই প্রাইভেট বা কোচিং-এর একটা ইতিবাচক আর্থ-সামাজিক দিকও রয়েছে। বাংলাদেশে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কয়েক হাজার শিক্ষিত বেকার রয়েছে যারা এই কোচিং-এর মাধ্যমে যে কোনো মাত্রায় আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পাশাপাশি কিছুটা হলেও পরিবারে অবদান রাখতে পারছে। এই কোচিং-এর মাধ্যমে কেউ তার গরীব বাবার হাতে মাস শেষে সংসারের খরচের জন্য কিছু টাকা দিতে পারে। কেউ তার অসুস্থ মায়ের ঔষধের টাকা যোগান দেয়। ছোট ভাই-বোনের লেখাপড়ার খরচও কিছুটা মেটাতে পারে। ঈদ ও পূজার সময় ছোট ভাই-বোনসহ পরিবারের সকলের জন্য নতুন কাপড়ের ব্যবস্থাও করতে পারে। আর এ সবই সে করে থাকে নিজের মাথা খাটিয়ে ও পরিশ্রম করে প্রাইভেট-কোচিং এর মত নির্দোষ ও বৈধ পেশার মাধ্যমে।
কিন্তু কোচিং ও প্রাইভেটের এই ইতিবাচক ও বাস্তব দিক না দেখে এটাকে এত নেতিবাচকভাবে নিয়ে যাওয়া হয়েছে যেন এটা আমাদের অন্যতম জাতীয় সমস্যা। প্রচারণা ও তৎপরতা এমন যে এক একটা কোচিং সেন্টারে যেন অপরাধ বাণিজ্য সাজিয়ে বসে আছে এক একজন কালপ্রিট! কোচিং কি ইয়াবা?

যা মৌলিক অধিকার ও ব্যক্তি স্বাধীনতার অংশ, যে কাজের মাধ্যমে কোনো ক্ষতিগ্রস্থ পক্ষ নেই, যে কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট হওয়া না হওয়ার সাথে কারো কোনোরুপ বাধ্যবাধকতা নেই সেরুপ বিষয়ে এতটা যুক্তিহীন নিন্দাবর্ষন ও অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ কতটা শোভনীয়?

লেখক : মানবাধিকার কর্মী
ই-মেইল:ংযধসসড়ংযধৎরভ@মসধরষ.পড়স