জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক মন্ত্রের দেশ মিয়ানমার এ কী করছে!

 

অধ্যাপক ড. সৈয়দ

আনোয়ার হোসেন : বৌদ্ধধর্মে শান্তির যে বাণী তা বলা হলো এই শিরোনামে। কিন্তু এই শিরোনামে যে মর্মবাণীটি উকীর্ণ তা তো বৌদ্ধধর্মের দেশ মিয়ানমার এখন অনুসরণ করছে না। মিয়ানমারের বৌদ্ধ সম্প্রদায় যথেষ্ট উগ্র ও সহিংস হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি জানা গেছে যে, মিয়ানমারে একাধিক উগ্র বৌদ্ধ সম্প্রদায় আছে, যারা মুলমানদেরকে

পছন্দ করে না এবং তারা অত্যন্ত জনপ্রিয় সরকারের কাছে। কাজেই বলা যায় যে, মিয়ানমারের যে বৌদ্ধ ধর্ম তা মূল বৌদ্ধ ধর্মের বিকৃতি; এবং সেই কারণে দেশটির বৌদ্ধরা এতো সহিংস ও উগ্র হয়ে উঠেছে।
মিয়ানমারে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গারা সেই মোঘল আমল বা তারও আগে থেকে আছে। কিন্তু সমস্যার সূত্রপাত হয় ১৯৫৮ সালে যখন দেশটিতে সামরিক শাসন শুরু হয়। এবং আমার কাছে মনে হয় যে মূল সমস্যার দুটি দিক আছে। একটা ধর্মীয়, আরেকটি অর্থনৈতিক। ধর্মীয় দিক থেকে আমরা দেখছি যে, গরিষ্ঠ ধর্মের অনুসারি বৌদ্ধরা লঘিষ্ঠ ধর্মের অনুসারি রোহিঙ্গাদের উপরে নির্যাতন চালাচ্ছে। কাজেই আপাতদৃষ্টিতে সংকটটি গরিষ্ঠ-লঘিষ্ঠ দ্বন্দ্ব হিসেবে প্রতীয়মান হতে পারে। কিন্তু আরেকটি দিক হচ্ছে যে, ওই রাখাইন রাজ্যটিকে পরিপূর্ণভাবে জনহীন করে গড়ে তুলবার পরে সামরিক সরকার অর্থনৈতিক কিছু প্রকল্প করতে চায় এমন তথ্য আমাদের হাতে এসেছে। সুতরাং রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে যা চলছে তা হচ্ছে জাতিবিনাশ, যাকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘এথনিক ক্লিনজিং’। যা চলছে তা একটি বর্বর দেশেই সম্ভব। কিন্তু আমরা জানি যে, মিয়ানমার রাষ্ট্রটির যে চরিত্র তাতে করে তারা নীতিকথা বা যুক্তির কোনো কথা কোনো সময় কার্যকর করেনি। তারা নিজের মতো করেই চলবার চেষ্টা করেছে।
এক সময় তো তথাকথিত গণতন্ত্রে উত্তরণের পূর্ব পর্যন্ত মিয়ানমারকে বলা হতো একটা বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে এটি একটি ভিন্নধর্মী ধর্মীয় রাষ্ট্র ছিল। তবে অং সান সুচির নেতৃত্বে মিয়ানমারে যে গণতন্ত্রের উত্তরণ হয়েছে তা অনেকটা প্রহসনমূলক। কারণ দেশটির সর্বময় ক্ষমতার চাবি-কাঠি এখনো রয়ে গেছে সেনাবাহিনীর হাতে। সংসদে তারা এক চতুর্থাংশ। ক্ষমতার ভাগাভাগিতেও তারা সিংহভাগ দখল করে আছে। অং সান সুচি আসলে একটি পুতুল সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পুতুল নাচাচ্ছে সামরিক বাহিনী। সুতরাং অং সান সুচি এখন যা বলছেন তা শান্তিতে নোবেল বিজয়ী একজন ব্যক্তিত্বের পক্ষে বলা সম্ভব নয়। তিনি যা বলছেন তা সামরিক বাহিনীর ভাষাতেই বলছেন। সামরিক বাহিনীর দৃষ্টিভঙ্গি এবং অং সান সুচির অবস্থান অভিন্ন। সেজন্যে অং সান সুচিকে দোষী করে আমরা বেশি একটা এগোতে পারব না। অং সান সুচি নিরূপায়, তিনি ক্ষমতা হারাতে চান না। গৃহবন্দি হতে চান না। নির্যাতিত হতে চান না। যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় থেকে যেতে চান।
রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গারা এখন নাগরিকত্বহীন এবং রাষ্ট্রদোহী। এদেরকে বলা হচ্ছে বাঙালি মুসলমান সন্ত্রাসী। মোঘল আমল থেকে এই অঞ্চলে বাঙালি গমন এবং আবাসন। ঠিক একই সময় থেকে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিসত্তাসমূহের আগমন এবং যারা বাংলাদেশের পরিপূর্ণ নাগরিক। তাহলে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক হবে না কেন? কফি আনান কমিশনের সুপারিশও অভিন্ন যে, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিতে হবে। কিন্তু লক্ষণীয়, কফি আনান কমিশন সুপারিশ চূড়ান্ত করার পরপরই নতুন করে ২৪ আগস্ট থেকে রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা আবার আসতে শুরু করেছে। তাদের আসা শুরু হয়েছিল সেই ১৯৭৮ থেকে, ইতোমধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ৭ লাখের মতো রোহিঙ্গা আছে। আর সাম্প্রতিককালে এসেছে ৩ লাখেরও বেশি। গোটা রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা তো ১১ থেকে ১২ লাখ বাস করত। তারা সবাই এখন উদ্বাস্তু, বিভিন্ন দেশে শরণার্থী শিবিরে তাদের আবাসন হয়েছে।
অন্যদিকে সারাবিশ্ব থেকে বাংলাদেশের নেতৃত্বে যে চাপটি দেওয়া হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে হবে। রোহিঙ্গারা যে ফেরত যেতে পারবে না এমন নানা তথ্য আমাদের কাছে এসেছে। উপরন্তু, সীমান্ত এলাকায় স্থলমাইন পুঁতে রাখা হচ্ছে, যেন রোহিঙ্গারা ফিরে যেতে না পারে। সবদিক থেকে এক ধরনের সন্ত্রাসের রাজ্য তৈরি করা হয়েছে এই রাখাইন রাজ্যটিতে। আমরা জানি যে, বিদেশি দাতা সংস্থাদের ত্রাণ কর্মকা- পরিচালনার কোনো অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। তা সত্ত্বেও কিন্তু বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে রাখাইন রাজ্যে যে ধ্বংসলীলার ছবি আমাদের হাতে উঠে এসেছে তা থেকে দেখা যাচ্ছে যে, রাখাইন রাজ্যটিকে কীভাবে মিয়ানমারের সামরিকতন্ত্র জনশূন্য করতে চাচ্ছে।
ভৌগোলিক এবং ঐতিহাসিক কারণে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংকটের শিকার হয়েছে সবসময়, যা ১৯৭৮ থেকেই চলমান। বর্তমান বাংলাদেশে আশ্রিত যে পরিমাণ রোহিঙ্গা এসেছে তাদের ভরণপোষণ করার মতো সামর্থ্য বাংলাদেশের মতো একটি ছোট দেশের পক্ষে সম্ভব নয়। উপরন্তু বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের নিয়ে একটি সমস্যা হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই মাদক ব্যবসায়ী, অস্ত্র চোরাচালানি বা উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য। তবে ব্যাপারটি আমার কাছে মনে হয় যে, এই মাদক ব্যবসা ও অস্ত্র ব্যবসা বা চোরাচালানের সঙ্গে স্থানীয় বাঙালি অনেক রাজনীতিবিদ নেতৃবৃন্দ জড়িত আছে। শুধু রোহিঙ্গাদের দোষী করে আমরা পার পাব না। আমাদের দেখতে হবে যে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত আমাদের এলাকায় সুশাসন চলছে কী না।
রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের উপরে বলা যেতে পারে অনেকটা হামলে পড়েছে। বাংলাদেশ কী করছে সেটি আমাদের বিবেচ্য এবং বাংলাদেশ কী করতে পারে সেটাও ভেবে দেখতে হবে। আমরা দেখেছি যে, বাংলাদেশ রোহিঙ্গা প্রশ্নে কোনো সুচিন্তিত দীর্ঘমেয়াদি নীতি কোনো সময় গ্রহণ করেনি। সবসময় সাময়িক ভিত্তিতে বা ইংরেজিতে যাকে বলা হয়, এডহক ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করেছে। তবে কূটনীতিতে অনেক সময় সাময়িক ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়; কিন্তু তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি একটা পরিকল্পনা থাকা দরকার, যেটা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখতে পাচ্ছি না। এখন সারা বিশ্বব্যাপী একটা প্রতিক্রিয়া গড়ে উঠেছে। এই প্রতিক্রিয়াকে কাজে লাগাতে হবে বাংলাদেশের। কারণ বুঝতে হবে বর্তমান রোহিঙ্গা সংকটটি যদি চলমান থাকে তবে এটা আরও জটিল এবং বহুমাত্রিক হয়ে উঠবে। যার ফলে আক্রান্ত হবে মিয়ানমার এবং বাংলাদেশ। কারণ রোহিঙ্গাদের একটি সংগঠন গড়ে উঠেছে ‘আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি’ সংক্ষেপে যাকে বলা হয় ‘আরসা’। এদের সংখ্যা এক হাজারের মতো। এদের অর্থায়ন হয় প্রবাসী রোহিঙ্গাদের দ্বারা এবং বিভিন্ন উগ্রবাদী সংগঠন দ্বারা। এরা ক্রমাগতভাবে বিভিন্ন মুসলিম উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়বে না তা বলা যাবে না। তবে এদের লক্ষ্য কিন্তু রাখাইন এলাকায় যে অন্যায়, অবিচার, শোষণ, নির্যাতন হয়েছে তা প্রতিবাদ করা। তারা কিন্তু কোনো স্বাধীন রাজ্য গড়া সম্পর্কে কোনো নির্দেশ দেয়নি। তবে ওই ধরনের সন্ত্রাস যদি ছড়িয়ে পড়ে তাহলে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার উভয় রাষ্ট্রই সংকটাপন্ন হবে। আরও একটা কথা মনে রাখতে হবে, সন্ত্রাসের কিন্তু ভৌগোলিক সীমারেখা নেই। কাজেই গোটা দক্ষিণপূর্ব এশিয়া সংকটাপন্ন হয়ে যেতে পারে। সেই কারণেই এই সংকটটি কূটনৈতিক পন্থায় রাজনীতিক পর্যায় সমাধান করা মিয়ানমারের দায়িত্ব। বাংলাদেশের উদ্যোগী হতে হবে পরিপূর্ণ সক্রিয় কূটনৈতিক মাধ্যমে এই সংকটটি সমাধানের জন্য গোটা বিশ্ব সম্প্রদায়কে বাংলাদেশের উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা। জাতিসংঘকে সক্রিয় করে তোলা দরকার। জাতিসংঘো নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনার জন্য প্রস্তাবও উঠে এসেছে। এমনকি বাংলাদেশের ড. মুহাম্মদ ইউনুস এতদিন পরে বিবেকের তাড়নায় একটি চিঠি লিখেছেন। কিন্তু সমস্যাটা হলো, মিয়ানমার য এই ধরনের কর্মকা- চালিয়ে যেতে পারছে আমরা লক্ষ্য করছি তার পেছনে রয়েছে চীনের সম্মতি, ভারতের সম্মতি এবং বলতে গেলে আসিয়ান দেশসমূহ তো আছেই। সেজন্যে খুব সহজ হবে না কূটনৈতিক পদ্ধতি। নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য আবার চীন। নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের প্রসঙ্গে কোনো কথা হলেই তখন দেখা যাবে যে চীন ভেটো দিতে পারে। কাজেই খুব জটিল কূটনৈতিক আবর্তের মধ্যে আছে রোহিঙ্গা সংকটটি তবুও কূটনৈতিক উদ্যোগের বিকল্প নেই। বাংলাদেশকে যথেষ্ঠ সক্রিয় এবং শক্তিশালী কূটনীতি অনুসরণ করতে হবে।
২০১২ সালে অং সান সুচি নোবেল পুরস্কার গ্রহণের সময় একটি ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই ভাষণের মূল কথাটি হলো যে, ‘যদি কোনো জনগোষ্ঠী নির্যাতিত হয় তাহলে তারা সংক্ষুব্ধ হয় এবং তারা উগ্রবাদী হয়ে ওঠে।’ ২০১৩ সালে দেখা গেল আরসা-‘আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি’ গড়ে উঠল। আমার কাছে মনে হয় যে, আরসা গড়ে উঠেছে অং সান সুচির বক্তব্যের বহিঃপ্রকাশের প্রকৃত দৃষ্টান্ত হিসেবে। যখন অং সান সুচি মানুষের মানুষের নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলছেন তখন তার দেশ এই একই ধরনের নির্যাতনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে। এটি একটি বিপন্ন বিস্ময়। সুতরাং সব মিলিয়ে একটা জটিল সংকটের আবর্তের মধ্যে আছে শুধু মিয়ানমার না বাংলাদেশও। এখন এক্ষেত্রে চীন এবং ভারতের ভূমিকা বিস্ময়কর। কারণ এখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। মানবাধিকারের প্রশ্নে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশ ভারতের সোচ্চার হওয়া উচিত ছিল। সেটা হয়নি। পেছনে ভূরাজনৈতিক ভূ-অর্থনৈতিক স্বার্থ আছে। একইভাবে চীনেরও ভূ-রাজনৈতিক ভ-ূঅর্থনৈতিক স্বার্থ আছে। কাজেই যেসব শক্তিশালী দেশ মিয়ানমারের প্রতি সহানুভূতিশীল এখনো আছে তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি আছে। বাংলাদেশকে এত জটিল কঠিন পরিস্থিতিতে এগিয়ে যেতে হলে সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। রোহিঙ্গা সম্পর্কে একটা দীর্ঘমেয়াদি নীতিও থাকতে হবে বাংলাদেশের। কারণ আমার কাছে মনে হয় রোহিঙ্গা সংকট সহজে সমাধান হওয়ার নয়। বাংলাদেশকে বহুদিন ব্যতিব্যস্ত থাকতে হবে।
পরিচিতি: ইতিহাসবিদ
মতামত গ্রহণ: সাইফুল ইসলাম