রাখাইনে পুলিশের স্থাপনা পুড়িয়েছে সেনা-মগেরাই!

আমাদের সময়.কম
প্রকাশের সময় : 13/09/2017 -4:15
আপডেট সময় : 13/09/ 2017-4:15

তারেক : মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মগ-মুরংদের জাতিগত দ্বন্দ্ব নিরসনে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে গঠিত কমিশনের প্রতিবেদন দাখিল করা হয় গত ১৮ আগস্ট। কফি আনান কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর মগ-দস্যুদের নির্যাতনের চিত্র। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে কিছু সুপারিশ পেশ করে আনান কমিটি। কিন্তু জাতিগত দ্বন্দ্ব নিরসনের শান্তিপূর্ণ উপায় খোঁজার এ পরামর্শ প্রদানের পরপরই অন্তত ২৪টি পুলিশ পোস্ট ও স্টেশনে অগ্নিসংযোগের অভিযোগ আনা হয় রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সলভেশন আর্মির (এআরএসএ) বিরুদ্ধে। এ অজুহাতে হত্যা-ধর্ষণ-লুটপাট-অগ্নিসংযোগ করা হয় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর। অথচ মিয়ানমার সরকার গত ১১ আগস্ট থেকেই রাখাইনে সেনা সমাবেশ ঘটায় এবং রোহিঙ্গা মুসলিমদের বাড়ি বাড়ি তল্লাশি শুরু করে। এ পরিস্থিতির মধ্যে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা কী করে পুলিশ পোস্ট বা পুলিশ স্টেশনে আগুন লাগাল তা এক বিশাল প্রশ্নের উদ্রেক করেছে।

মিয়ানমারের গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, ১০ পুলিশ সদস্য, এক সেনাসদস্য এবং এক ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা নিহত হয় বিদ্রোহীদের হামলায় তথা নাশকতায়। কিন্তু অগ্নিদগ্ধ সেসব পুলিশ স্টেশন ঘেঁষে বসবাসকারী সে দেশের প্রত্যক্ষদর্শী রোহিঙ্গারা বলছেন, দিনের আলোয় মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সদস্যরাই পেট্রল ঢেলে পুলিশ স্টেশনে আগুন ধরিয়েছে। রাতের অন্ধকারে সেনাবাহিনীর জিপ আসার পর আগুন ছড়িয়ে পড়েছে পুলিশ ফাঁড়িতে। আবার আগুন জ্বালিয়ে সেনাসদস্যরা রোহিঙ্গা পাড়ায় এসে নাটকীয়ভাবে সন্দেহভাজন রোহিঙ্গাদের শনাক্ত করে বলতে থাকে, ‘তোরা (রোহিঙ্গারা) পুলিশ স্টেশনে আগুন দিয়েছিস।’ এরপর শুরু হয় রোহিঙ্গা নিধন।

নিরক্ষর রোহিঙ্গাদের ধারণা, পরিকল্পিতভাবে তাদের বিতাড়নের জন্যই পুলিশ স্টেশনে নাটক করে আগুন দেওয়া হয়। ধারণা করা হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও মগ-মুরংদের যুগ যুগ ধরে চলা নিষ্পেষণ এবং রোহিঙ্গাদের জীবনমান উন্নয়নের পন্থা সংবলিত আনান কমিশনের রিপোর্ট নস্যাৎ করার টার্গেট রেখে পরিকল্পিতভাবে ‘অগ্নিকা-’ নাটক তৈরি করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী।

শাহপরীর দ্বীপে কথা হয় মিয়ানমারের মংডু জেলার বাচিডং এলাকার ৩৫ বছর বয়সী কিষানি মরিজান বেগমের সঙ্গে। তিনি ওই পুলিশ স্টেশনে অগ্নিকা-ের সময়কালীন একজন প্রত্যক্ষদর্শী। মরিজান বলেন, ওরা আমার ৫ বছরের মেয়ে সামিরাকে পানিতে ফেলে হত্যা করে। স্বামীকে গুলি করার পর জবাই করে। স্বামী ও মেয়ের করুণ মৃত্যুর পর এ নিয়ে কোনো মিথ্যা বলব না। সেদিন দুপুর দুটার দিকে রান্না করছিলাম। স্বামী ছিল ধানক্ষেতে। হঠাৎ করে গাড়ি থেকে আর্মিরা নামে। তারা থানায় আগুন ধরিয়ে দেয়। ঘরের পাশে থাকায় আমি সব স্পষ্ট দেখতে পাই। আমি সেদিন পুলিশ-মিলিটারি কাউকে মরতে দেখিনি। এক পুত্র ও তিন শিশুকন্যাকে নিয়ে রাতের আঁধারে নিজের জন্মভূমি ত্যাগ করেছেন মরিজান।

টেকনাফ-কক্সবাজার সড়কের বালুখালীতে রাস্তার পাশে বসেছিলেন ৪৫ বছর বয়সী নুরুল আমিন। সঙ্গে তিন মেয়ে, দুই ছেলে ও স্ত্রী। অন্যদের মতো তিনিও মংডুর রাচিডং এলাকা থেকে নাফ নদী পেরিয়ে এসেছেন। কৃষক নুরুল আমিনের বাড়ি থেকে ওই পুলিশ স্টেশনের দূরত্ব আধা কিলোমিটার হবে। তিনি বলেন, সেদিন দুপুরে পুলিশ স্টেশনে কারা আগুন দিয়েছে সেটি বলতে পারব না। তবে আগুন জ্বলার সময় সেনাবাহিনীর লোকজন সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল। পাশে দেখা গেছে মগদেরও।

গত ৬ দিন আগে মংডু থেকে শাহপরীর দ্বীপ হয়ে এসেছেন রশিদ উল্লাহ, আশ্রয় নিয়েছেন বালুখালী সড়কের পাশে খোলা আকাশের নিচে। এই আঠারো বেলায় কবে খেয়েছেন, তা মনে নেই পঞ্চাশোর্ধ্ব এই কৃষকের। রশিদ উল্লাহর ভাষ্য, রাত তিনটার দিকে পুলিশ স্টেশনে আগুন দেওয়া হয়। আগুন জ্বলে ওঠার পর সেনাবাহিনীর গাড়ি রাস্তা দিয়ে চলে যায়।

একই তথ্য উঠে এসেছে মংডু থানার খুবই কাছাকাছি বসবাসকারী সিতারা বেগমের কথায়। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, রাত ৩টার দিকে আর্মিরা থানায় আগুন দেয়। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠলে ঘুম ভাঙে আমার। চেয়ে দেখি আর্মিরা দাঁড়িয়ে আছে, তাদের পাশে আছে মগরা। একপর্যায়ে সেনাবাহিনী চলে যায়। তখনো আগুন জ্বলছিল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মগরা বলতে থাকে, ‘তোরা আগুন দিয়েছিস। বাঁচতে হলে বাংলাদেশে চলে যা।’ বাধ্য হয়ে রাতের আঁধারে বাংলাদেশের পথে রওনা হই।
সিতারা বলেন, এতদিন এসব মগের সঙ্গে একই সমাজে বসবাস করেছি, সুসম্পর্কও ছিল। কিন্তু একদিনের ব্যবধানে দেখেছি, তারা আমাদের চোখের সামনে রোহিঙ্গাদের জবাই করেছে। হয়তো প্রতিবেশী হওয়ায় তাদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছি।
বালুখালী সড়কে কথা হয় একদল যুবকের সঙ্গে। শেষ বিকালে মংডুর দুম্বাই টেংখালী এলাকায় একই ফুটবল মাঠে খেলতেন। আড্ডা দিতেন ঝুপড়ি চায়ের দোকানে। পূর্বসূরিদের বসতভিটা ফেলে তারা প্রত্যেকেই ঈদের দিন সপরিবারে পালিয়ে এসেছেন কক্সবাজারে। এদের মধ্যে একজন নুরুল আমিন। নুরুল আমিন এই প্রতিবেদককে বলেন, মগরা বলছে, আমরা নাকি আগুন দিয়েছি। অথচ নিজ জন্মভূমিতে আমরা রোহিঙ্গারা চোরের মতো বসবাস করি। আগুন দেওয়া দূরের কথা, মগ-মুরংদের গায়ে একটি ঢিল ছোড়ারও সাহস নেই আমাদের। আসলে ওরা অজুহাত তৈরি করে আমাদের দেশ থেকে বের করে দিয়েছে। অপরাধ আমরা মুসলিম। কৃষক নুরুল আমিন জানান, নিজেরা প্রাণে বেঁচে গেলেও পথে পথে স্বজাতির লাশের সারি দেখে এসেছেন তারা।
গত দুদিনে টেকনাফ-উখিয়ার বালুখালী, থাইংখালী, কুতুপালং, তাজিনমারখলা এলাকা ঘুরে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, পুলিশ স্টেশনে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার এমন নাটকীয় তথ্য। এতে স্পষ্ট, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সদস্যরাই পুলিশ স্টেশনে আগুন দিয়ে রোহিঙ্গা বিতাড়নের এমন বর্বর কৌশল বেছে নিয়েছে। এতে ব্যবহার করা হয়েছে ইতিহাসের জঘন্যতম দস্যু খেতাব পাওয়া আরেক জনগোষ্ঠী মগদের।

রোহিঙ্গাদের হামলায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যদের প্রাণ হারানোর কথা বলা হলেও সেসব লাশের প্রকৃত চিত্র এখনো আসেনি মিয়ানমারের বা আন্তর্জাতিক কোনো গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে। মুখে মুখে কিংবা সু চি সরকারের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে শুধু সেনাসদস্যদের লাশের সংখ্যাই বলা হচ্ছে।

এদিকে অন্যান্য দিনের মতো গতকালও নাফ নদী তীরবর্তী কক্সবাজারের হোয়াইচ্যং, লেদা, হ্নীলা, শাহপরীর দ্বীপ, সাবরাংয়ের উল্টো পাশের মিয়ানমার ভূখ-ে কু-লী পাকানো আগুন দেখা গেছে। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, বর্বর সেনাবাহিনী ও মগ-মুরংরা এসব আগুন ধরিয়ে দেয়। উদ্দেশ্য, রোহিঙ্গারা যেন নিজের ভূখ- ছেড়ে প্রাণভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।

আগুনে বসতভিটা পোড়ানো, হত্যা-নির্যাতনের কারণে অন্যান্য দিনের মতো গতকাল মঙ্গলবারও একের পর এক জেলে নৌকায় করে সারিবদ্ধভাবে শাহপরীর দ্বীপের জেটি এলাকায় নামে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। তাদের অনেকেই জানান, মিয়ানমার সেনাবাহিনী মাইকে গত দুদিন ধরে তাদের আলটিমেটাম দিয়েছে। সেনাবাহিনী হুমকি দিয়ে বলছে, মঙ্গলবার রাতের মধ্যে মিয়ানমার ত্যাগ না করলে তারা ব্রাশফায়ার করবে। কোনো রোহিঙ্গাকে বাঁচিয়ে রাখা হবে না।

সূত্র : আমাদেরসময়

এক্সক্লুসিভ নিউজ

সত্তর হাজার লাগাম থাকবে জাহান্নামের

সাইদুর রহমান: জাহান্নামের আকৃতি-প্রকৃতি কেমন হবে এ বিষয়ে হাদীস শরীফে... বিস্তারিত

স্কুলে শাস্তির পক্ষে ৬৯ শতাংশ মা-বাবা

নিজস্ব প্রতিবেদক: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিশুরা বেত, ডাস্টার, স্কেল দিয়ে শারীরিক নির্যাতন... বিস্তারিত

রোহিঙ্গা শিক্ষার্থীদের জন্য স্কলারশিপ বাড়াবে তুরস্ক

মরিয়ম চম্পা : রোহিঙ্গা শিক্ষার্থীদের জন্য স্কলারশিপ বাড়াবে তুরস্ক। রোহিঙ্গা... বিস্তারিত

আর্জেন্টাইন সাবমেরিন এখনো লাপাত্তা

প্রিয়াংকা পান্ডে: রোববার শত চেষ্টার পরও হারিয়ে যাওয়া আর্জেন্টাইন সাবমেরিনের... বিস্তারিত

তারেক রহমানের ৫৩তম জন্মদিনে কেক কাটলেন খালেদা জিয়া

মাঈন উদ্দিন আরিফ: বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও পুত্র তারেক রহমানের... বিস্তারিত

রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনে জাপানের সমর্থন

আবু সাইদ: বাংলাদেশ সফররত জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারো কোনো বলেছেন, ২০২১... বিস্তারিত





আজকের আরো সর্বশেষ সংবাদ

Privacy Policy

credit amadershomoy
Chief Editor : Nayeemul Islam Khan, Editor : Nasima Khan Monty
Executive Editor : Rashid Riaz,
Office : 19/3 Bir Uttam Kazi Nuruzzaman Road.
West Panthapath (East side of Square Hospital), Dhaka-1205, Bangladesh.
Phone : 09617175101,9128391 (Advertisement ):01713067929,01712158807
Email : [email protected], [email protected]
Send any Assignment at this address : [email protected]