আহমদ রফিকের প্রতিক্রিয়াশীল জাত্যাভিমান!

আবিদুল ইসলাম : ‘কালের কণ্ঠ’ পত্রিকায় বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী আহমদ রফিক ‘এ দেশে রোহিঙ্গা ভূমির আশঙ্কা কি অমূলক’ নামে একটা নিবন্ধ লিখেছেন।(১) শুরু করেছেন “মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলের অধিবাসী রোহিঙ্গাদের ওপর চলছে অমানুষিক নির্যাতন।”- এই বাক্যটি দিয়ে। পড়ে মনে হতে পারে নিপীড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি তার দরদ উথলে উঠছে। কিন্তু থরে থরে সাজানো বাক্যাবলির সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে যেতে থাকলেই নিবন্ধটির মূল সুর ধরা পড়বে।
প্রথম প্যারাতেই লিখেছেন, “ঢেউয়ের মতো থেকে থেকে চলছে বাংলাদেশে আর্ত রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ।” ‘আর্ত’ রোহিঙ্গারা প্রাণ বাঁচাতে তাহলে বাংলাদেশে ‘অনুপ্রবেশ’ করছে! ভালো কথা। তারপর কী?

“এই অনুপ্রবেশের প্রথম পর্বে বাংলাদেশ মানবিক চেতনার তাগিদে তাদের সাময়িক আশ্রয় দিয়েছিল চট্টগ্রাম সীমান্তে বসবাসের ব্যবস্থা করে। তারা আর ফিরে যায়নি। বরং তারা এ আশ্রয়দানের মর্যাদা রাখেনি। জড়িয়ে পড়েছে নানা ধরনের অনৈতিক, অবৈধ, অসামাজিক ও সাম্রাজ্যবাদী কূট চক্রান্তের বেড়াজালে। চট্টগ্রামের গভীর অরণ্যে পাওয়া গেছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র ও প্রশিক্ষণের আলামত। তারা নানা সামাজিক অপরাধের সঙ্গেও জড়িত। এককথায় বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা। এ ছাড়া তাদের অংশ নিতে দেখা গেছে রামুর বৌদ্ধপল্লীতে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায়। ঘনবসতির ভূখণ্ড বাংলাদেশে তারা অনভিপ্রেত সমস্যা তৈরি করে চলেছে।”

নিপীড়ন-গণহত্যার শিকার একটি জনগোষ্ঠী পার্শ্ববর্তী আরাকান রাজ্য থেকে উগ্র বৌদ্ধ ফ্যাসিস্ট শক্তি, বার্মিজ আর্মি, নাসাকা এবং অন সান সুচির ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসির ক্যাডারদের তাড়া খেয়ে নাফ নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে এসে মানবতের জীবন যাপন করা রোহিঙ্গাদের একাংশ যদি এ দেশীয় অপরাধচক্রের ফাঁদে পড়ে বাধ্য হয়ে কোনো অপরাধে জড়িত হয়-ই, তার দায়ে ঐ অপরাধচক্রের হোতাদের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ না করে দোষ চাপাতে হবে অসহায় রোহিঙ্গাদের ঘাড়ে!

পুরো লেখাটাই এ ধরনের চরম প্রতিক্রিয়াশীল, জঘন্য, জাত্যাভিমানী বক্তব্যে ভরপুর। লেখক স্বীকার করেছেন যে মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন চলছে, তারা বেঁচে থাকার তাগিদে পালাতে এবং বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন- এসবই কিন্তু সেই সাথে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে তীব্র জাতি-বিদ্বেষমূলক বক্তব্য রাখতেও ভুলে যান নি।
বলছেন, “দেশের শাসনব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে কর্মরত সবাই যে দুর্নীতিমুক্ত স্বদেশপ্রেমী হবেন—এমন তো কোনো কথা নেই। তা ছাড়া আছে দলগত মতভেদ, সে সুযোগ নিচ্ছে দুর্নীতিপরায়ণ, অনৈতিক চেতনার রোহিঙ্গারা। এ পরিস্থিতি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনের জন্য সমস্যা ডেকে আনবে। অবস্থাদৃষ্টে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আমাদের আহ্বান, তারা যেন রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে নানা মাত্রিক বিচারে গুরুত্ব দিয়ে বাস্তব পরিস্থিতির মোকাবেলায় তাত্ক্ষণিক ও দীর্ঘস্থায়ী নীতি গ্রহণ করে। এবং তা প্রয়োগে সর্বাত্মক শক্তি ব্যবহার করে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো যে দুর্নীতি, অনৈতিকতা, মাদক ব্যবসা ও অবৈধ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের আখড়া, সে কথা সরকারের অজানা থাকার কথা নয়।”
একই সাথে তিনি সমর্থন করছেন বাংলাদেশের সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গা ‘অনুপ্রবেশ’ বন্ধে গৃহীত সশস্ত্র ব্যবস্থাকে। তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? রোহিঙ্গারা সশস্ত্র ফ্যাসিস্ট শক্তির তাড়া খেলেও প্রাণ বাঁচাতে এ দেশে আশ্রয় নিতে পারবেন না, তাদেরকে সীমান্তের ওপারে বসে মরতে হবে!

আহমদ রফিক আর দশজন উগ্র জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবীর পরিচয়ে এসব কিছু বললে হয়তো করার কিছু ছিল না। কিন্তু সমস্যা হলো তিনি বাংলাদেশের বামপন্থী মহলের একাংশে নিজেকে ‘প্রগতিশীল’ ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন। সম্প্রতি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাথে যুগ্মভাবে ‘অক্টোবর বিপ্লব শতবর্ষ উদযাপন জাতীয় কমিটি’র আহ্বায়ক হয়েছেন, যে কমিটিতে আবার আছেন বাংলাদেশের কিছু বামপন্থী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী। অথচ অক্টোবর বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সোশ্যাল-ডেমোক্রেটিক পার্টিগুলোর প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন সামাজিক-জাত্যাভিমানী অবস্থানের বিরুদ্ধে তীব্র সংগ্রামের ধারাবাহিকতায়, যে সামাজিক-জাত্যাভিমানের প্রতিনিধিত্ব করছেন আহমদ রফিক নিজে!
[লিখেছেন; আবিদুল ইসলাম (বাম ধারার ‘ছাত্র ফেডারেশনের’ সাবেক নেতা) ফেইসবুক পোষ্ট, ১ সেপ্টেম্বর ২০১৭, https://www.facebook.com/abidul.islam2/posts/1533011496755995]
নোট:
(১) আহমদ রফিক,
এ দেশে রোহিঙ্গা ভূমির আশঙ্কা কি অমূলক, কালের কন্ঠ, ৩১ আগস্ট, ২০১৭
http://www.kalerkantho.com/…/sub-editorial/2017/08/31/538134