স্বাধীনতা, বঙ্গবন্ধু এবং আমাদের উন্নয়ন

 

ড. অনুপম সেন : বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এনে দিয়েছিলেন এই বাংলার স্বাধীনতা। ইতোপূর্বে বাঙালির অনেক স্বাধীন রাজ্য ছিল যেমন: সুলতানি আমলে সেন, পাল আর মুঘল আমলে আলিবর্দী খাঁ থেকে যারাই বাংলার নবাব হয়েছিলেন তাদের স্বাধীন নবাব বলা হয়। যদিও কথিত আছে, তারা ছিলেন মুঘল সা¤্রাজ্যের সুবেদার। বলা যেতে পারে যে, তারা স্বাধীনভাবে রাজ্য পরিচালনা করেছেন। কিন্তু স্বাধীন রাজ্যগুলোকে রাজারা এবং রাজার আশেপাশের লোকজন স্বাধীন থাকতে দেয়নি। ফলে প্রকৃতপক্ষে তারা ছিল পরাধীন। বাঙালি সত্যিকার অর্থে পাকিস্তানের অধীনে ২৩ বছর ছিল। এই ২৩ বছর ছিলও এমনÑ ব্রিটিশ শাসনের ১৯০ বছরে যেমন বাংলার সম্পদ চলে গেছে এবং বাঙালি দরিদ্র হয়েছে। কিন্তু ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ থেকেও বেশি ছিল পাকিস্তানিদের শোষণ। নিপীড়ন। নির্যাতন।
বাংলা এবং বাঙালির সব সম্পদ, অর্থ্যাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় সব সম্পদ লুণ্ঠন করে নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান গড়ে ওঠেছিল এবং এ অবস্থা থেকে বঙ্গবন্ধু বাঙালিকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন। স্বাধীনতার স্বপ্ন প্রথম মুক্ত হয় ছয় দফার মাধ্যমে। তাকেই পূর্ণতা দেওয়া হয় ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ এবং ১৬ ডিসেম্বর। বাঙালি তার স্বাধীন রাষ্ট্র পায়। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কয়েক হাজার ব্রিজ, কালভার্ট ভাঙা ছিল, বড় বড় ব্রিজ ধ্বংস করেছিল পাকিস্তানি সেনারা। তার উদাহরণ বহন করে আছে ভৈরব ব্রিজ, যেটি চট্টগ্রাম এবং ঢাকার একমাত্র সেতুবন্ধন ছিল। পাশাপাশি ১ কোটি লোক ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল। দেশের মধ্যে ২ কোটি লোক অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হিসেবে ছিল। এসব মানুষকে এক বছরের মধ্যেই পুনর্বাসিত করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। সেই সময় আশঙ্কা করা হচ্ছিল, এক কোটি লোক না খেয়ে মারা যাবে কিন্তু সত্যিকার অর্থে একজন লোকও মারা যায়নি।
যুদ্ধবিধস্ত বাংলাদেশকে গড়ে তুলছিলেন বঙ্গবন্ধু। তখন সারা বিশ্বজুড়ে মহামন্দা এবং মুদ্রাস্ফীতি হয়েছিল। সাধারণত একইসঙ্গে মন্দা এবং মুদ্রাস্ফীতি হয় না। কিন্তু সেটিই হয়েছিল। এমন পরিস্থিতির মধ্যে সবেমাত্র বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে এগোচ্ছিল, ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালে শিল্পায়ন, উৎপাদন বাড়ছিল খুব দ্রুত ঠিক সেই সময় বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল। হত্যা করার পর সামরিক সরকার ক্ষমতায় এলো। এবং ১৯৯১ সাল পর্যন্ত দেশ শাসন করল। এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে প্রতিবছর জিডিপি খুব সামান্যই বেড়েছে। বঙ্গবন্ধুর সময়, ৭৪-৭৫ সালে প্রায় উৎপাদন ৯ শতাংশের মতো বেড়েছিল। যদিও সেই সময় বেসরকারি ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণে ঋণ দেওয়া হয়েছিল। দেখা গেল সেই ঋণের বেশিরভাগই খেলাপি হয়েছিল।
এরশাদ যখন ক্ষমতা ছাড়েন, তখন খেলাপি ঋণের পরিমাণ অনেক বেড়ে গিয়েছিল। সেই খেলাপি ঋণ কিন্তু বন্ধ করা যায়নি। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালে শেখ হাসিনার সময়ে একইসঙ্গে শিল্প প্রবৃদ্ধি যেমন বেড়েছে, তেমনি বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছিল। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশে পাট ছিল দুই-তৃতীয়ংশ জায়গায়, বন্যা ছিল। তখন আশঙ্কা করা হচ্ছিল বহু লোক খাদ্যাভাবে মারা যাবে। বিনা পয়সায় খাদ্য সরবরাহ করে মানুষকে বাঁচানো হয়েছিল। ১৯৯৯-২০০১-এ কৃষির জন্য ভর্তুকি দেওয়া হয়। তার ফলে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়।
পরিচিতি: শিক্ষাবিদ ও উপদেষ্টাম-লীর সদস্য, আওয়ামী লীগ
মতামত গ্রহণ: ফাতেমা-তুজ-জোহরা
সম্পাদনা: আশিক রহমান ও মোহাম্মদ আবদুল অদুদ