খুনিদের ট্যাঙ্কে গোলা দিয়েছিল কে সফিউল্লাহ নাকি খালেদ? 

রাহাত মিনহাজ  : ১৯৭৫ সালে নবীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে এই ট্যাঙ্ক ছিল মাত্র ৩০টি। যার মধ্যে ২৮টি ট্যাঙ্কই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা ও সেনানিবাসসহ পুরো ঢাকা শহরে আতঙ্ক তৈরিতে ব্যবহার করেছিল খুনি চক্র। জাতির জনককে হত্যার পর ওই ট্যাঙ্কগুলো অবস্থান নেয় ধানমিন্ডর ৩২ নম্বর, রক্ষীবাহিনীর কার্যালয়, রেডিও-টিভি স্টেশন, সেনাসদর, বঙ্গভবন, ফার্মগেটসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে। এমনকি ট্যাঙ্ক নিয়েই খন্দকার মোশতাকের আগামসী লেনের বাড়িতে গিয়েছিলেন মেজর রশীদ। সামরিক গবেষকরা মনে করে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার নীল নকশায় এই ট্যাঙ্কগুলোর বিশেষ ভূমিকা ছিল। রাজধানীবাসীর মনে আতঙ্ক তৈরিতে বিশেষভাবে সক্ষম হয় এই যন্ত্রদানবগুলো। তবে একটা বিষয় খুবই বিস্ময়কর অভিযানের সময় এই ট্যাঙ্কগুলো ছিল সম্পূর্ণ গোলাশূন্য। অর্থাৎ কোনো ট্যাঙ্কেই কোনো গোলা ছিল না। যন্ত্রদানবগুলো ছিল শুধু বিশাল আকৃতির যান। যার কোনো রকমের কার্যক্ষমতা ছিল না। এই ট্যাঙ্কগুলো নিয়ে বিশাল এক জুয়া খেলেছিলেন খুনি মেজর ফারুক। অবাক করা বিষয় হলো জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর খুনিদের এসব ট্যাঙ্কে গোলা সরবরাহ করা হয়। কিন্তু কে সরবরাহ করল এই গোলা? খুনিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে তাদের ট্যাঙ্কে সেই গোলা সরবরাহ করাকে সে সময় কোনো সেনাকর্মকর্তা জরুরি মনে করেছিলেন? এসব প্রশ্ন নিয়ে এখন অনেক রহস্য আছে। আছে নানামুখী তথ্য। কিন্তু সত্য স্বীকার করে সেই দায় আজও কেউ নেননি। না সফিউল্লাহ, না খালেদ মোশাররফ, না সাফায়াত জামিল। সবাই ছিলেন সেই সময়ের সুবোধ বালাক। তারা কিছুই করেননি?   ট্যাঙ্কের এই ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন তার ‘বাংলাদেশ: রক্তাক্ত অধ্যায় (১৯৭৫-৮১)’ গ্রন্থে। বইটির ৫০ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন ‘এই প্রথম আমি জানলাম যে ফারুকের কোনো ট্যাঙ্কেরই মেইন গানের কোনো গোলাবারুদ রাতের অভিযানের সময় এবং প্রায় সকাল ১০টা পর্যন্ত ছিল না। ফারুক বলতে লাগল কত বড় ঝুঁকি নিয়ে গোলাবারুদ ছাড়াই এই অভিযানে বের হয়েছিল। এমনকি তাদের ট্যাঙ্কের মেশিনগানের গোলাবারুদ না থাকাতে ১৫ তারিখ ভোরে সিওডি এর গেট ভেঙে কিছু গোলাবারুদ নিয়ে আসে তা শুধু মেশিনগানের জন্য। ফারুক আরও জানাল গোলাবারুদ না থাকা সত্ত্বেও তারা খালি ট্যাঙ্ক নিয়ে সকলকে এমনকি রক্ষীবাহিনীকে ফাঁকি দিতে পেরেছে। কারণ ১৫ আগস্ট যখন বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে হামলা করা হয় তখন ফারুক দুটো ট্যাঙ্ক নিয়ে শেরে বাংলা নগরে রক্ষীবাহিনীর হেডকোয়ার্টার ঘেরে ফেলে এবং সেখানে নিয়োজিত রক্ষীবাহিনীকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। সিজিএস সব শুনে তক্ষণি রাজেন্দ্রপুরে ট্যাঙ্কের গোলাবারুদ দেওয়ার কথা বলে দিলেন।’ উল্লেখ্য সে সময় সিজিএস বা চিফ অফ জেনারেল স্টাফ ছিলেন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ। প্রশ্ন আসে সেনাবাহিনীতে বঙ্গবন্ধুন পছন্দের সেনা কর্তা খালেদ মোশাররফ কেন খুনিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে তাদের খালি ট্যাঙ্কগুলোতে গোলাবারুদ দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। এ ঘটনা সত্যিই এক রহস্য। আমরা প্রায় সবাই জানি খালেদ মোশাররফ ও কর্নেল সাফায়াত জামিলের মধ্যে গভীর সম্পর্ক ছিল। এই গোলা দেওয়া প্রসঙ্গে কর্নেল সাফায়াত জামিলের ভিন্নমত পাওয়া যায়। সাফায়াত জামিল তার ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ রক্তাক্ত মধ্য আগস্ট ও ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর’ গ্রন্থে দাবি করেছেন খুনিদের গোলাবিহীন ওইসব ট্যাঙ্গে গোলা সরবরাহ করেছিলেন সেনাপ্রধান সফিউল্লাহ। কার কথা সত্য? কি ঠিক? তা এক বড় রহস্য। এ রহস্যের আজও কোনো সমাধান হয়নি। নানা বিষয় পরিষ্কার হলেও কেউ এই বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য দেননি। তবে সার্বিক পর্যবেক্ষণ থেকে মনে হয় ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সেনাবাহিনীর অনেকেই পরিবর্তিত পরিস্থিতি মেনে নিয়েছিলেন। তারা হয় উল্লসিত ছিলেন অথবা দেশ সেনাবাহিনীর অধীনে চলে আসায় মনে মেন খুশি ছিলেন। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তাদের অনেকে ব্যথিত হলেও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার মতো অবস্থানে কেউই ছিলেন না। সুবোধ বালক সফিউল্লাহ সবকিছু মেনে নিয়ে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন বরখাস্ত হওয়ার জন্য। অন্যদিকে সাফায়াত জামিল ও খালেদ মোশাররফ দায় চাপিয়েছেন অন্যের ঘাড়ে। লেখক: প্রভাষক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগসম্পাদনা: আশিক রহমান