ওবার্থুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছে ইসি

তারেক : চুক্তি লঙ্ঘন, রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ, নির্বাচন কমিশনের ইমেজ বিনষ্ট করা এবং কয়েকশ’ কোটি টাকা ক্ষতিসাধন করা সুুনির্দিষ্ট এই চার অভিযোগ এনে স্মাটকার্ড প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ফ্রান্সের ওবার্থুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কার্ড বিতরণের দায়িত্বপ্রাপ্ত ইসির আইডিয়া প্রকল্প কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টের আইন বিশেষজ্ঞ আজমালুল হোসেন কিউ সিকে আইনি পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ করার সিদ্ধান্তও চূড়ান্ত হয়েছে। শিগগিরই মামলার প্রক্রিয়া শুরু হবে। ইসি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে স্মার্টকার্ড প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ করা হয় এক হাজার ৩৭৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে স্মার্টকার্ড মুদ্রণ থেকে বিতরণ পর্যন্ত হিসাব ধরেই অর্থ বরাদ্দ করা হয়। আর ওবার্থু টেকনোলজির সঙ্গে ব্লাংক কার্ড উৎপাদন, সাপ্লাই এবং মুদ্রণ ও বিতরণে চুক্তি হয় ৮০৯ কোটি টাকার। ২০১৫ সালের ১৪ জানুয়ারি চুক্তি অনুযায়ী দেড় বছরের মধ্যে অর্থাৎ ২০১৬ সালের ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে ভিতথ্রি ফ্রান্স থেকে ৯ কোটি কার্ড উৎপাদন করে বাংলাদেশে আমদানিকরণ, ইসির পারসো সেন্টারে মুদ্রণ করে উপজেলা-থানা পর্যায়ে বিতরণ করা এবং সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের এ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ প্রদান ও ডকুমেন্টেশন হস্তান্তর করারই ছিল ইসির লক্ষ্য। কিন্তু ওবার্থু কার্যক্রম সম্পাদনে বিভিন্ন সমস্যা, অজুহাত উপস্থাপন করতে থাকে। এক পর্যায়ে কার্ডের হলোগ্রাম সমস্যার জন্য দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ করে এবং ২য় পক্ষের সঙ্গে চুক্তির নামে প্রকল্পের অনুমোদন গ্রহণ করে। চুক্তির মেয়াদের দেড় বছরে ৯ কোটির মধ্যে ব্লাংক কার্ড উৎপাদন ও সাপ্লাই দেয় মাত্র ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। আর ৯৬ দশমিক ৫০ শতাংশই বাকি থাকে, যা প্রতিষ্ঠানটির ব্যর্থতার পরিচয় বহন করে। একইভাবে, কার্ড মুদ্রণ হয় ১ দশমিক ৫১ শতাংশ। এ ক্ষেত্রেও ব্যর্থতা ৯৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং উপজেলা-থানা পর্যায়ে বিতরণ হয় মাত্র ১ দশমিক ১৩ শতাংশ। এতে ব্যর্থতা ছিল ৯৮ দশমিক ৮৭ শতাংশ।
সূত্র জানায়, এতো ব্যর্থতার পরও প্রতিষ্ঠানটিকে আরো ১ বছর মেয়াদ বাড়িয়ে দেয় ইসি। নির্ধারিত সেই সময় শেষ হয় চলতি বছরের ৩০ জুন। হলোগ্রাম সমস্যার জন্য কার্ড উৎপাদন বন্ধ থাকায় যথাসময়ে কার্ড উৎপাদন ও পারসোনালাইজেশন নিশ্চিত করার স্বার্থে ফ্রান্সের ভিতথ্রির পাশাপাশি চীনের শেনজে-কে কার্ড উৎপাদনের অনুমতি দেয়া হয়। প্রকল্প থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করার পরও ওবার্থু টেকনোলজি প্রকল্প শেষ করার কোন উদ্যোগ নেয়নি। উদ্যোগের মধ্যে ছিল পারসোনালাইজেশন মেশিনের সর্বোচচ ব্যবহার নিশ্চিত করা, সর্বোচ্চ থ্রু পুট অর্জিত হওয়া, অনসাইট মেইনটেন্যান্স টিমের মাধ্যমে টেকনিক্যাল সার্পোট নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় জনবলের সংস্থান করা, ও ট্রেনিং ও ডকুমেন্টেশন সম্পন্ন করা। এসব উদ্যোগের একটিও বাস্তবায়ন না করে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেয় প্রতিষ্ঠানটি।
এদিকে তাদের অপেশাদার আচরণের কারণে পরবর্তী মেয়াদ বাড়ানোর পরও গত বছরের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত মুদ্রণ বন্ধ ছিল। এতে মেশিনের উৎপাদন ক্ষমতা কমে মধ্য এপ্রিলে ৩টি মেশিনে নেমে আসে। সর্বশেষ বাড়ানো ১ বছর মেয়াদের মধ্যে কোনো উন্নতি ঘটেনি বরং অবনতির চিত্রই ফুটে ওঠে। ৩০ জুন পর্যন্ত স্মার্টকার্ড বাস্তবায়নের চিত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ব্লাংক কার্ড উৎপাদন ও সাপ্লাইয়ের পরিমাণ ছিল ৬৬ দশমিক ৩৬ মিলিয়ন। অগ্রগতির হার ৭৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ, ব্লাংক কার্ড উৎপাদন ও সাপ্লাই বাকি ছিল ২৩ দশমিক ৬৪ মিলিয়ন, এক্ষেত্রে কোম্পানির ব্যর্থতা ছিল ২৬ দশমিক ২৭ শতাংশ। একইভাবে, কার্ড মুদ্রণ মাত্র ১২ দশমিক ৪১ শতাংশ এবং ব্যর্থতা ৮৬ দশমিক ২১ শতাংশ এবং ওই সময়ে উপজেলা-থানা পর্যায়ে বিতরণে ব্যর্থতা ছিল সংস্থাটির ৮৭ দশমিক ৮০ শতাংশ।
প্রকল্পের এই নাজুক অবস্থা দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে ইসি। পরিস্থিতি উত্তরণে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সিইসির সভাপতিত্বে কমিশন সচিব ও আইডিয়া প্রকল্প পরিচালক বৈঠক করেন। পরবর্তী সময়ে সিইসি ওবার্থুর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আরেকটি বৈঠক করেন। সেখানেও রাষ্ট্রদূত উপস্থিত ছিলেন। এই বৈঠকের পর আরো কিছু পদক্ষেপ নেয়ার অঙ্গীকার করে সংস্থাটি। যার মধ্যে ১০টি মেশিনে সর্বোচ্চ থ্রু পুট করা, অতিরিক্ত ১৫টি মেশিন আনা, অন সাইট সাপোর্ট সার্ভিস নিশ্চিত করা, মেইনটেইনেন্স টিম ও ইকুইপমেন্ট সরবরাহ, ৩টি শিফট চালু ও অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ এবং ট্রেনিং ডকুমেন্টেশন সম্পন্ন করা। ইসির কাছে সংস্থাটির অঙ্গিকার ছিল ৩০ জুন তারিখের মধ্যে কাজ শেষ করা। এর আগে সংস্থাটিকে ১৫টি নোটিশ ও তাগিদপত্র দেয়া হলেও কোনোটিই আমলে নেয়নি। আর প্রতিশ্রুত ১৫টি মেশিনের বদলে ৮টি আমদানির কথা থাকলেও সেটি পূরণ করেনি। উল্টো ওবার্থু ই-মেইলের মাধ্যমে ১৩ মে ইসির তথ্য ভাণ্ডারে প্রবেশাধিকার ও অডিট করার বিষয়ে আগ্রহ দেখায় এবং পুনরায় চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর তাগিদ জানায়। ফলে ৩০ জুন তারিখের মধ্যে কার্যকরি উন্নতি না করায় ওই সময়ই চুক্তি শেষ হয়।
এ বিষয়ে জাতীয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাব্যবস্থাপক এবং আইডিয়া প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ব্রি, জে. মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম জানান, ওবার্থু টেকনোলজি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। এই প্রকল্পে তাদের ব্যর্থতা অমার্জনীয়। এখন পর্যন্ত স্মাটকার্র্ড প্রিন্ট (পারসোনাইলেজেশন) হয়েছে মাত্র ১২ দশমিক ৪১ শতাংশ। এ ব্যর্থতার জন্য কোনোভাবেই ওবার্থুকে ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই। চুক্তি ভঙ্গের কারণে রাষ্ট্রের সঙ্গে যে প্রতারণা করেছে সে জন্য তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি বলেন, দেশের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনে যেখানে যাওয়া দরকার সেখানে যাওয়া হবে। তবে, প্রতিষ্ঠানটি যদি সহজে আসে তাহলে সহজে মীমাংসা হবে এবং তারা যদি জটিল পথে যায় তখন প্রয়োজনে বিকল্প ব্যবস্থা। মানবকণ্ঠ