বিচারকরা রায় ইংরেজিতে কেন লিখেন?

আর রাজি : রাষ্ট্রের ভাষা বাংলা, সংবিধানের ভাষা বাংলা, সংসদের সব আলোচনা হয় বাংলায়, জনগণের ভাষা বাংলা, অধিকাংশ ক্ষেত্রে আদালতে সাওয়াল-জবাব হয় বাংলায়, কিন্তু আমাদের উচ্চ আদালতের মহামান্য বিচারকরা অধিকাংশ রায় দেন ইংরেজিতে! এটা কি কিংস কোর্টই রয়ে গেছে? না কি অন্য কিছু রয়েছে এর অন্তরালে?

“ন্যায়বিচার যদি সদগুণ হয় এবং জনগণের কল্যাণের জন্যই যদি এর কাজ হয়, তবে তা জনগণের ভাষাতেই হওয়া উচিত” – এ নিয়ে আজও কি কোনো তর্কের অবকাশ আছে?

রাষ্ট্র-কাজে, শাসন-কাজে তো সাধারণ জনগণের সুবিধার দিকটিই সবার আগে বিবেচিত হওয়ার কথা। কার জন্য রায় লেখেন আমাদের বিচারকরা?

এদেশে যারা ইংরেজিতে লিখালিখি করেন তারা নিজেদের লিখিত ভাষায় নিজেরা মুগ্ধ হতে চান, না কি এককালে যাদের সেবা করেছেন তাদের মুগ্ধ করতে চান বলে তারা বাংলায় না লিখে ‘রাজভাষায়’ লিখেন- এ প্রশ্ন উঠলে তা কি খুব অবান্তর হবে?বিচারকরা যদি যা বলতে চাচ্ছেন তা বাংলায় না বলতে পারেন তাহলে সেই রায় যাদের জন্য দেওয়া সেই জনগণ রায়ের বিষয়টি কেমন করে অনুধাবন করব? মায়ের ভাষায় যে বিষয়টি নিয়ে অধিকাংশ বিচারক লিখতে “পারেন না” সে বিষয়টি যে তারা যথাযথভাবে বুঝেছেন, তা আমরা, সাধরণরা কীভাবে বিশ্বাস করতে পারি? আর যদি তাঁরা, বাংলাভাষা জেনেও ভিনদেশি ভাষায় রায় দেওয়াকেই শ্রেয়তর জ্ঞান করে এই ধারা অব্যহত রাখেন তাহলে রাষ্ট্রের মালিকদের এই বিশেষ পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে নতুন করে ভাবতে হবে বৈ কি।

সংবিধান বাংলায়, সেখানে ৩নং অনুচ্ছেদে বাংলাভাষায় পরিষ্কার বলা আছে, “প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা”, ১৯৮৭ সাল থেকে সংসদের সকল আইন প্রণীত হচ্ছে বাংলায় আর শাসনতন্ত্র বিষয়ক জটিলতা নিয়ে যখন উচ্চ বিচারালয়ের দারস্থ হতে হচ্ছে, তখন প্রজাতন্ত্রের এই সেবকরা আমার মতো রাষ্ট্রজনদের জন্য হতবুদ্ধিকর এক ভাষায় নজির উপস্থাপন করছেন, অবোধ্য ভাষায় যুক্তি দিচ্ছেন আর ভিনদেশি ভাষায় রায় বলছেন!

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে/পর্যবেক্ষণে যা বলা হয়নি তেমন কিছু ভাষ্য না কি রাজনীতির মাঠে ছড়িয়ে যাচ্ছে। অনেকে আক্ষেপ করছেন, রায়টি বাংলায় অনুবাদ এখনো কেন কেউ করছে না। তাঁদের বিশ্বাস, জনগণকে সত্য জানানো দরকার, সত্য না জেনে জনগণ মহামান্য বিচারালয়কে ভুল বুঝতে পারে।

এখানে সাধারণ জনগণের ভুল বোঝার আশঙ্কা করা হচ্ছে কিন্তু বাস্তবে রাজনীতিবিদসহ আরও অনেক শ্রেণী-পেশার মানুষের ভুল বা উলটা বোঝার শঙ্কা রয়েছে। এটি তো বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এ দেশের রাজনীতিবিদদের অধিকাংশের (আদালতীয়) ইংরেজি জানা নাই এবং তার দরকারও নাই। আদতে এদেশের অধিকাংশ মানুষেরই কোনো দিন ইংরেজি জানার প্রয়োজন ছিল না, ভবিষ্যতেও তার প্রয়োজন হবে বলে মনে হয় না। আর সব মানুষকে ইংরেজি শিক্ষা দেওয়া বাস্তবে সম্ভবও না।
অনুমান করি, মহামান্য আদালতের রায় নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির অবসান তখনই সম্ভব যখন আমাদের বিচারকরা আমাদের ভাষায় কথা বলবেন, রায় লিখবেন। আর এই স্বল্প সংখ্যক বিচারককেই বরং বাংলাভাষাটা “শেখানোর” আয়োজন করাটা সহজতর কিংবা তাদেরকেই বিচারক পদে নিয়োগ দেওয়া উচিত যাঁরা বাংলায় নিজের বিচার্য বিষয়ে লিখতে জানবেন। একই সাথে এ বিধানও করা যেতে পারে যে, বিচারকদের যদি কারও ভিন্ন কোনো বিবেচনা বা প্রয়োজন থাকে, তাঁরা বাংলার পাশাপাশি তাঁদের রায় ইংরেজি করে নিতে বা করিয়ে নিতে পারবেন।

রাষ্ট্র যাদের, তারা ক্রমশ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও শাসনতান্ত্রিক কাজে আরও বেশি বেশি অংশ নিতে চাইবে, কর্মভার নিজের কাঁধে তুলে নিতে চাইবে- এ কালের দাবি। সঙ্গত কারণেই বহু বিচিত্র শাসনতান্ত্রিক সমস্যা সমাধানে এ দেশের জনগণকে উচ্চ আদালতের ন্যায়শাস্ত্র বিশারদ বিনিশ্চয়াকদের দারস্থ হতে হবে, কিন্তু তাঁরা যদি রাষ্ট্রের অধিকর্তাদের ভাষায় রায় বিধান করতে ব্যর্থ হন তাহলে এই রাষ্ট্রে শাসনতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক হানাহানির অবসান অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। ন্যায়কাররা নিশ্চয়ই আমাদের দেশে ন্যায় প্রতিষ্ঠায় আরও এগিয়ে আসবেন। রাষ্ট্রের মালিক, রাষ্ট্রজনদের বোধগম্য ভাষায় তাঁরা তাঁদের সব বিচার নিষ্পন্ন করবেন। আর যত দিন তাঁরা তা না পারছেন, তাঁদের নিজেদের তত্ত্বাবধানেই তাঁদের ভিনদেশি ভাষায় লিখিত রায়ের বাংলা অনুবাদ করার সুব্যবস্থা করে একই সাথে দুই ভাষাতে রায় প্রকাশ করবেন- অধিকতর ন্যায় প্রতিষ্ঠার স্বার্থে এমন বিধান তাঁরা নিজেরাই নিশ্চয়ই করে নিবেন। এর ব্যতিক্রমে, বিচার্য বিষয়ে তাঁদের বিধান নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির দায় তাঁদেরকেই নিতে হবে। মনে রাখা দরকার, সমস্যা সমাধানের বিচার যাঁদের হাতে ছিল, সমস্যা প্রকটতর করার অভিযোগ প্রমাণিত হলে যথা সময়ে ইতিহাস তাঁদের যথাস্থানেই স্থান দেবে।

সূত্র : ফেসবুক থেকে