বিএনপি কি ভাবছে কেউ তাদের গদিতে বসিয়ে দেবে?

কাজী সিরাজ : বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার লন্ডনে অবস্থান দীর্ঘ হবে তা আগে থেকেই জানা ছিল। তার অনুপস্থিতিকালীন দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং দল পুনর্গঠনের অসম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন করার জন্য দলীয় শীর্ষ নেতাদের নির্দেশ দিয়ে যান তিনি।

কিন্তু প্রায় এক মাসে কিছু কিছু জায়গায় দলের প্রাথমিক সদস্যপদ প্রদান ও নবায়নের ‘টুক-টাক’ অনুষ্ঠান ছাড়া বড় ধরনের কোনো সাংগঠনিক কর্মসূচি পালন করতে দেখা যায়নি দলটিকে। প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে, রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে ৭০ থেকে ১২০-১৩০ জনের ‘বিশাল’ কিছু সমাবেশে কোনো কোনো ‘বড় নেতার’ ভাষণ আর নয়াপল্টন পার্টি অফিসে প্রায় প্রতিদিন আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ের মধ্যেই যাবতীয় কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ থাকতে দেখা যাচ্ছে। ‘সমাবেশ’ যেগুলো করা হয় তাও মূল দল বা প্রধান প্রধান সহযোগী দলের উদ্যোগে নয়, ভুঁইফোড় কিছু নতুন ‘দোকানের’ উদ্যোগেই হয় এসব ‘সমাবেশ’। কোনো কোনো নেতা নিজের ‘খরচায়ও’ এমন কিছু অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন বলে শোনা যায়। এমনো শোনা যায়, মূল দল বা উল্লেখযোগ্য অঙ্গ ও সহযোগী দল যেসব ‘নেতাকে’ পাত্তা দেয় না তারা নিজেদের পৃষ্ঠপোষকতাতে এমন কিছু ‘সংগঠন’ তৈরি করিয়ে রেখেছেন। এরকম নানা ‘কিসিমের’ দোকান এখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কোনো কোনো সুযোগসন্ধানী ব্যক্তিও করে রেখেছেন এবং তারা তাদের মুরব্বি বা মুরব্বিদের নিয়ে প্রোগ্রামও করেন। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এসব সংগঠনের অপতৎপরতা ও দলের এবং দলীয় সরকারের ভাবমূর্তি বিনাশী স্বার্থান্বেষী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অবিরাম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে যাচ্ছেন। বিএনপিতে এই জাতীয় ‘দোকানপাট’ খোলা ও জিয়া-খালেদা, জিয়া-তারেক রহমানের নাম ভাঙিয়ে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সুবিধা লাভের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই। আবার সাংগঠনিক কোনো তৎপরতাও দৃশ্যমান নয়। অথচ দিন যত যাচ্ছে আগামী সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলকে গোছানোর তৃণমূলের নিষ্ঠাবান নেতাকর্মী-সমর্থকদের উদ্দীপ্ত ও উজ্জীবিত করার সুযোগ ও সম্ভাবনা ততই হারাচ্ছে। ‘জাতীয়’ ও ‘কেন্দ্রীয়’ নেতারা ঢাকার বাইরে যান না খুব একটা। স্থায়ী কমিটির সদস্য ১৯ জনের মধ্যে দুটি পদ এখনো খালি। বেগম খালেদা জিয়া ছাড়া বাকি ১৬ জনের মধ্যে কক্সবাজারের সালাহউদ্দিন আহমদ আইনি জটিলতায় ভারত থেকে আসতে পারছেন না। বাকি ১৫ জনের মধ্যে একমাত্র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামকে মাঝে মাঝে, কালেভদ্রে ঢাকার বাইরে যেতে দেখা যায়। বাকি ১৪ জনের কে কখন দলের কাজে ঢাকার বাইরে গেছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য হওয়ার পর? এবার দলে ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়েছে ৩৫ জনকে। পার্টি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য করা হয়েছে পৌনে-একশ (৭৩ জন) জনকে। এদের কী কাজ তারাও বোধহয় জানেন না। একবার এদের সম্পর্কে এক লেখার হেডিং দিয়েছিলাম— ‘বিএনপিতে ৭৩ জন নেতায়ে-খামাখা’। সবাই তো প্রায় পরিচিত। কেউ কেউ বলেছেন, ঠিকই তো লিখেছেন। দায়িত্ব-কর্তৃত্ব না থাকলেও ‘কানা

ছেলের নাম পদ্মলোচন’-এর মতো উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্যদের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে দলের ভাইস চেয়ারম্যানের। ১৪+৩৫+৭৩ = ১২২ জন চাইলে সারা দেশ চষে বেড়াতে পারেন। শুভানুধ্যায়ীরা বললেই জবাব দেন, ভাই রাস্তায় নামলেই গুলি করে, গুম-খুন হয়, মামলা-মোকদ্দমার ভারে জর্জরিত ইত্যাদি ইত্যাদি। ব্রিটিশ আমল বাদ দিলাম, পাকিস্তান আমল থেকে এদেশে বাকশক্তি ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ভাষার অধিকার, মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার, স্বায়ত্তশাসন, ৬ দফা ও ১১ দফা আন্দোলন এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা আন্দোলনের কোন পর্যায়ে শাসকগোষ্ঠী আন্দোলনকারীদের জন্য রাস্তায় ফুল বিছিয়ে রেখেছিল? আদর্শবাদী কোন আন্দোলনে জেল-জুলুম, মামলা-মোকদ্দমার খড়গ ছিল না? শহীদ হতে হয়নি বহু গণতন্ত্রের সৈনিককে? গুলির ভয়, মৃত্যুর ভয় থাকলে তো এত লোক মুক্তিযুদ্ধে যেত না, ৩০ লাখ বীর শহীদ হতো না। নীতি-আদর্শের জন্য রাজনীতিতে সর্বদাই ঝুঁকি থাকে। যারা প্রকৃত জনদরদি ও দেশদরদি রাজনীতিবিদ তাদের ঝুঁকি নিতে হয়। রাজনৈতিক ঝুঁকি নিতে যারা ভয় পায়, সেসব কাপুরুষের জন্য রাজনীতি নয়। রাজনীতিবিদ পরিচয় দেবেন, বড় বড় পদ-পদবি বাগাবেন, কিন্তু প্রকৃত অর্থে রাজনীতি করবেন না, অর্পিত দায়িত্ব পালন করবেন না, তা হলে দলের লক্ষ্য কীভাবে অর্জিত হবে। কীভাবে তৃণমূলের আদর্শবাদী নেতা-কর্মীদের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হবে, কীভাবে পূর্ণ হবে অগণিত দেশবাসীর স্বপ্ন? আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির সামনে একটা সুবর্ণ সুযোগ এসেছিল ঘুরে দাঁড়ানোর। কিন্তু বিএনপি তা পারছে কই। এটা সত্য যে, শাসক লীগ বিএনপির সঙ্গে গণতান্ত্রিক আচরণ করছে না। ক্ষেত্রবিশেষে বড় নিষ্ঠুর। বিএনপির সমর্থন শক্তি আওয়ামী লীগের প্রায় সমান। সরকারি দলের (তাদের মিত্ররাসহ) সমর্থন বাড়িয়ে যদি ৪০% ধরি, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ৬০% মানুষ। আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে কাজে লাগাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তারপরও শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্বে অধিকতর শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে ঘরে ঢুকিয়ে রাখতে পারছে তারা। ক্ষমতায় থাকাকালে বিএনপিও প্রশাসনকে কম ব্যবহার করার চেষ্টা করেনি। কিন্তু আওয়ামী লীগ সব প্রতিবন্ধকতা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে বিএনপিকে ক্ষমতার বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে। একটা কথা এ প্রসঙ্গে বলতেই হয় যে, বিএনপি নেতারা কথায় কথায় গুলির কথা বলেন। কিন্তু বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত অনুমোদিত কিংবা অননুমোদিত কোন সভা-সমাবেশ বা মিছিলে গুলি করে কাউকে হত্যা করা হয়েছে। গুম, খুন, গুলি হচ্ছে না সে কথা বলছি না। ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলমদের গুম হওয়ার কথা দেশবাসী জানে। খুন কি শাসক দলের লোকও কম হয়েছে গত সাড়ে আট বছরে? ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন প্রতিরোধে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে তুমুল আন্দোলনের কথা আমাদের ভুলে যাওয়ার কথা নয়। বিএনপি-সরকার নির্বিঘ্নে সে নির্বাচন করতে পারেনি। ঘোষিত তারিখে বহু আসনেই নির্বাচন শেষ করা যায়নি। সেই সংসদও টিকিয়ে রাখা যায়নি। আওয়ামী লীগ-জামায়াতে ইসলামী আর জাতীয় পার্টির তুমুল আন্দোলনের মুখে ১৫ দিনও টেকেনি সেই সংসদ। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পরিচালিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনের কাছে নতিস্বীকার করে বিরোধী দলের দাবি মানতে বাধ্য হয় খালেদা জিয়ার সরকার। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রথা বাতিলও করেছে আওয়ামী লীগ। কী করেছে বিএনপি? কিছুই করতে পারেনি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনটি কেমন হয়েছিল সবারই তা জানা। ‘আগামী নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হোক’ তা চান না বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও প্রকারান্তরে স্বীকার করে নিয়েছেন যে সে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। ৩০০ আসনের সংসদে ১৫৩ জনই বিনা-নির্বাচনে, বিনা-ভোটে সংসদ সদস্য হয়ে গেছেন। এটা আমাদের সংবিধানের ৬৫(২) অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। বিএনপি অনেক হাঁকডাক ছেড়েছিল যে, সে নির্বাচন তারা প্রতিহত করবে। কী করতে পেরেছে সবাই দেখেছে। এর পর ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তারা ‘অসহযোগ আন্দোলন’ করলেও কিন্তু কোনো নেতাকে কখনো মাঠে দেখা যায়নি। সে আন্দোলনও ব্যর্থ হয়েছে। এর আগে হেফাজতের শাপলা চত্বর সমাবেশের দিন স্বয়ং বেগম খালেদা জিয়া দলের নেতা-কর্মী ও ঢাকাবাসীকে পক্ষে নামার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ঢাকাবাসী তো দূরের কথা, বিএনপির কোনো দায়িত্বশীল নেতাকেও দেখা যায়নি মাঠে। বিপুল জনসমর্থন থাকার পরও একটি দল কী করে ‘ক্ষয় রোগে’ আক্রান্ত রোগীর মতো ধুঁকতে থাকে বিএনপি তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ। নেতারা যে কেন মাঠে নামেন না, কেন যে কর্মীদেরও গুলির ভয় দেখান তা খুব একটা দুর্বোধ্য বিষয় নয়। সরকারি ক্ষমতা ব্যবহার করে এই দলের ‘কেউকেটারাও’ আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ নয়, তালগাছ হয়ে গেছেন বলে অভিযোগ বেশ জোরালো। গোয়েন্দাদের ভয়, দুদকের ভয়, জেলের ভয় এদের সর্বক্ষণ তাড়িয়ে বেড়ায়। তাদের ‘আমলনামা’ সরকারের হাতেও থাকা স্বাভাবিক। যখন কোনো প্রোগ্রামের কথা ভাবা হয়, ‘এই আমলনামা’ দেখিয়ে চোখ রাঙালেই সরকারের কাজ হয়ে যায় বলে সাধারণ মানুষও মনে করে। আওয়ামী লীগ যে বলে বিএনপির কিছু করার শক্তি নেই। কথাটা সত্য নয়। আগেই উল্লেখ করেছি, বিএনপির জনসমর্থন আওয়ামী লীগের থেকে কম নয়। তাদের সংকট নেতৃত্বের সংকট, তাদের সংকট সাংগঠনিক দুর্বলতার সংকট। আরও বড় সংকট সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংকট, যে সংকট আওয়ামী লীগে নেই। এই সংকটের মূলে হচ্ছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দ্বি-কেন্দ্রিক জটিলতা। নানা ক্ষেত্রে ঢাকা-লন্ডন মতদ্বৈধতাও তীব্র সংকট সৃষ্টি করে বলে রাজনৈতিক মহলে প্রচার আছে। প্রবীণ রাজনীতিবিদরা সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় না থাকাও দলটির আরেক বড় সংকট। দল এখন অনেকটা ‘করপোরেট হাউসের’ মতো হয়ে গেছে বলে মনে হয়। কিছু ‘স্টাফ অফিসারই’ দল চালায় বলে শোনা যায়। দলের সিনিয়র নেতারা জিজ্ঞেস করলে হয়তো লজ্জায় স্বীকার করবেন না যে, কোনো জরুরি প্রয়োজনেও তারা তাদের নেত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন না। গুলশান অফিসের কর্মচারীদের ধরে তাদের প্রোগ্রাম নিতে হয়। ততক্ষণে প্রয়োজনটাই হয়তো আর থাকে না। কিছু দিন আগে দলের স্থায়ী কমিটির কয়েকজন প্রবীণ সদস্যের এমন অমর্যাদার কাহিনী সোশ্যাল মিডিয়ায়ও এসেছিল।

সরকার ও সরকারি দলও এখন খুব একটা সুখে নেই। সর্বত্রই মনে হচ্ছে একটা নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থা। অর্থ-বিত্ত গড়ার একটা কম্পিটিশন চলছে বলে মনে হয়। দলীয় কোন্দলে গত সাড়ে আট বছরে প্রায় তিন হাজার নেতা-কর্মী খুন হয়েছে তাদের। দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্ষণসহ নানা অপকর্মে দলীয় লোকদের লিপ্ত হতে দেখা যাচ্ছে সম্প্রতি। তোলাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজিসহ নানা ‘বাজিকরিতে’ শাসক দলের ও বিভিন্ন সহযোগী দলের নেতা-কর্মীরা জড়িয়ে পড়েছেন বলে মিডিয়ায় প্রায় প্রতিদিনই খবর আসছে। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ধমক-ধামকে কোনো কাজ হচ্ছে না। রামু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও সাঁওতাল এলাকায় ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকদের ওপর জুলুম-নিপীড়ন-অগ্নিসংযোগ, প্রতিমা ভাঙচুর ইত্যাদিতে জড়িয়ে পড়েছে অসাম্প্রদায়িকতার মূলমন্ত্রে কমিটেড দলটির একশ্রেণির নেতা-কর্মী। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্তের গত ছয় মাসের বিভিন্ন সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যের প্রতি নজর দিলে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের চিত্র বেরিয়ে আসে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযোগের আঙ্গুল সরকার ও সরকারি দলের লোকজনের বিরুদ্ধে। অতি সাম্প্রতিক একটি বিষয় সরকারের জন্য এক ক্ষতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যস্ত করার সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার রায় সরকারের সর্বোচ্চ মহলের সবারই কপালে ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। আইনমন্ত্রী খোলাখুলিই বলেছেন, এতে তারা হতাশ, ক্ষতিগ্রস্ত ও ক্ষুব্ধ। বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট ও পার্লামেন্টের মধ্যকার। পার্লামেন্ট যে ক্ষমতা নিয়ে নিয়েছিল, বিচার বিভাগ ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে তা আবার ফিরিয়ে নিয়ে এসেছেন। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা ভোগ করবে, এই বিধানটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের বহুল আলোচিত পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধনীতেও বহাল রেখেছিল বর্তমান সরকারি দল। ষোড়শ সংশোধনীতে তা বাতিল করা হয়।

এ ব্যাপার সুপ্রিম কোর্ট-পার্লামেন্টের বিষয়ে সরকারও জড়িয়ে গেছে। হতাশ, ক্ষতিগ্রস্ত, ক্ষুব্ধ হতে পারে পার্লামেন্ট; সরকার কেন? এখানেই বিজ্ঞজনরা বলছেন, সরকার বিচার বিভাগের ওপর ছড়ি ঘোরাতে চেয়েছে বলে অভিযোগ মিথ্যে নয়। সরকারের দায়িত্বশীলরা প্রকাশ্যেই এই রায়ের এবং প্রধান বিচারপতির কিছু পর্যবেক্ষণের সমালোচনা করছেন। আইন কমিশন কেন এ বিতর্কে জড়ালো বোঝা গেল না। সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের ‘দেশটা এখন মনে হচ্ছে জাজেস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ’ হয়ে গেছে বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা হচ্ছে চতুর্দিকে। এমন সমালোচনাও হচ্ছে যে, সরকারি ইচ্ছাতেই তিনি বক্তব্য দিয়েছেন রায় নিয়ে। সরকারি ইচ্ছায় না হলেও তার বক্তব্যে সরকার দারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন বিচারপতি খায়রুল হকের মুন সিনেমার মালিকানা নির্ধারণের মামলায় সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী, ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলসহ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের বিষয়সমূহ নতুন করে সামনে আসছে। অবসরে যাওয়ার দীর্ঘ ১৬ মাস পর স্বাক্ষরিত তার সেই রায় রিভিউর প্রশ্নও তুলেছেন কেউ কেউ। এ বিষয়ে সরকার ‘ব্যাক ফুটে’ এটা স্পষ্ট। বিএনপির জন্য এ রায় নিয়ে সুপ্রিম কোর্টকে বিব্রত না করে দল গোছানো এবং আগামী নির্বাচনে ৩০০ আসনে দলের ও ২০ দলীয় জোটের যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের কাজে মনোনিবেশ করাই শ্রেয় মনে করেন পর্যবেক্ষকরা। জামায়াতে ইসলামী নিয়ে তাদের দ্বান্দ্বিক অবস্থানের অবসান সরকারই গুটিয়ে দিয়েছে। হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সখ্য গড়ে সরকার ও সরকারি দল এখন জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির জোট-রাজনীতির বিরুদ্ধে কথা বলার নৈতিক অধিকার হারিয়ে ফেলেছে। এসব ব্যাপারে বিএনপির কোনো হুঁশ আছে বলে মনে হচ্ছে না। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে আনন্দে তারা আত্মহারা। কিন্তু বিএনপি কি অন্য কেউ তাদের গদিতে বসিয়ে দেবে ভাবছে? প্রধান বিচারপতি তো বলেই দিয়েছেন, ‘সরকার বা বিরোধী দল কারও ফাঁদেই পড়বেন না। ’

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।

সূত্র : বিডি প্রতিদিন