ট্রাম্পের ৯ ভুল

লিহান লিমা: গল্ফ প্রিয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বা নির্দিষ্ট গর্তে বল ফেলতে গিয়ে বারবার ভুল করেন। এক্ষেত্রে গল্ফের মাঠের মতই এক চিলতে আঁকাবাঁকা খাল, ঘাস, সবুজ উদ্যান ও বালির টিলা কাটাতে গিয়ে বল ঠিকমত গর্তে ফেলতে পারেন না ট্রাম্প। কখনো হয়ে যায় পেনাল্টি আবার কখনো বল চলে যায় মাঠের বাহিরে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই ভুলগুলো নিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

১. বাগাড়ম্বর ভুল

নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই ট্রাম্প মেক্সিকো সীমান্তে দেওয়াল নির্মাণ ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কথা বলে আসছেন। ক্ষমতা গ্রহণের পর ইরান, সিরিয়া, সুদান, লিবিয়া, ইয়েমেন, ইরাক ও সোমালিয়ার ওপর সাময়িক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও মার্কিন আদালত জানায়, ওই সব দেশের যেসব ব্যক্তি বর্তমানে আমেরিকায় বসবাস করছেন তাদের দাদা-দাদি, নানা-নানিসহ অন্যান্য রক্তের সম্পর্কীয় আত্মীয়রা এ নিষেধাজ্ঞা আদেশের বাইরে থাকবে। একই সঙ্গে মেক্সিকো সীমান্তে দেওয়াল নির্মাণ ইস্যুতে ভাটা পড়েছে। উপরন্তু মেক্সিকোতে সৃষ্টি হয়েছে মার্কিন বিরোধী মনোভাব ও রাজনীতির।

২. অনভিজ্ঞ ভুল
প্রেসিডেন্টের এক মাস না পেরোতেই রুশ সংশ্লিষ্টতার দায়ে পদত্যাগ করেন ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইকেল ফ্লিন। ওয়াটার গেট কেলেঙ্কারীর সঙ্গে এই ঘটনার তুলনা করা হয়। যা এখনো ট্রাম্পকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। এছাড়া প্রেসিডেন্সির দায়িত্ব গ্রহণ করতে না করতেই ওবামাকেয়ার বাতিল করলেও নিজ দলের সমর্থন পায়নি ট্রাম্পের স্বাস্থ্যসেবা বিল।

৩. রুশ কেলেঙ্কারী
সম্প্রতি ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণা টিমের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনকারী পল ম্যানাফোর্টের বাসভবনে তল্লাশি অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু ফাইল ও জিনিসপত্র জব্দ করেছে গোয়েন্দা সংস্থা এফবি আই। এছাড়া রুশ আইনজীবীর সঙ্গে ট্রাম্প জুনিয়রের বৈঠকে ট্রাম্পের প্রচার প্রধান পল ম্যানাফোর্ট ও ইভানকা ট্রাম্পের জীবনসঙ্গী জ্যারেড কুশনারের উপস্থিতি নিয়ে এখনো পরিস্থিতি শান্ত হয় নি।

৪. উপদেষ্টা নির্বাচনে ভুল
ওভাল অফিসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কৃষ্ণাঙ্গ নেতাদের সঙ্গে ছবি তোলার সময় সামনের সোফায় হাঁটু মুড়ে বসে ছিলেন তার উপদেষ্টা কেলিয়ান কনওয়ে। এটি নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক সমালোচনা। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের শপিংমল নর্দস্টোম ইভানকার পণ্য রাখতে অস্বীকৃতি জানালে সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে এর সমালোচনা করে সমালোচিত হন কেলিয়ান।

৫. বৈদেশিক ভুল
সিরিয়াতে রাসায়নিক হামলার জন্য বাশার আল আসাদ সরকার ও রাশিয়াকে দায়ী করে দেশটির এক বিমান ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এর পর পরই রাশিয়ার বিরুদ্ধে ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ক্রেমলিন বলেছে, এই হামলার পর সিরিয়ার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হবে।

এছাড়া জাতিসংঘে চীনের সমর্থন নিয়ে উ.কোরিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা জারির পরও ট্রাম্পের স্বস্তি মেলে নি। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পিয়ংইয়ংকে আগুনে জ্বালানোর হুমকি দেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো ধরনের পরমাণু হামলার জবাব দিতে উত্তর কোরিয়া সক্ষম বলে জানায় দেশটির সরকার। শনিবার ট্রাম্প টুইটে বলেন, সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করা হবে। এমন প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।

৬. স্বজনপ্রীতির জাল
প্রেসিডেন্সির শুরুতেই মেয়ের জামাই জ্যারেড কুশনারকে হোয়াইট হাউসের অন্যতম জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা করায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগে সমালোচিত হন ট্রাম্প। এরপর প্রকাশিত হয় রুশ রাষ্ট্রদূত সের্গেই কিসলিয়াকের সঙ্গে তিনবার গোপনে যোগাযোগ করেছিলেন কুশনার। এর আগে ট্রাম্প জানান, নির্বাচনের আগে এক রুশ আইনজীবীর সঙ্গে ট্রাম্প জুনিয়রের গোপন বৈঠকের ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না। এরপর জানা যায়, জুনিয়র সত্য গোপন করে যে বক্তব্য গণমাধ্যমকে প্রেরণ করেন, ট্রাম্প নিজে তার নির্দেশনা দিয়েছেন।

৮. সৌদি প্রেম
সৌদি প্রতি ট্রাম্পের এতই বিশ্বাস যে নিজকে প্রমাণ করার জন্য তিনি যদি বলেন, আমি বিশ্বের সবচাইতে মেধাবী মানুষ। এর পরের কথাটি হবে, সৌদিকেই জিজ্ঞাসা করে দেখো না। বিদেশ সফরটি রিয়াদ থেকেই প্রথম শুরু করেন ট্রাম্প। কাতার ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একাধিক টুইটে সৌদি আরবের পক্ষ নিয়েছেন। আবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিলারসনকে নিরপেক্ষ কিংবা কাতার-ঘেঁষা আচরণ করতে দেখা গেছে। এক জরিপে দেখা যায় সৌদি আরবকে ‘শত্রু’ বা ‘অবন্ধুভাবাপন্ন’ রাষ্ট্র হিসেবে মনে করেন শতকরা ৩৫ ভাগ মার্কিন নাগরিক।

৮. লাভের হিসেবে ভুল
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় যে প্যারিস চুক্তি হয়েছিল তা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের উপর ‘অর্থনৈতিক বোঝা’ চাপিয়ে দেয়া হয়েছে বলে তিনি মনে করছেন। তাছাড়া ট্রাম্পের মতে হিজড়া সদস্যদের চিকিৎসা ব্যয় বহন করা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা খাতের জন্য একটি বিশাল বোঝা এবং তারা কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে থাকে। এই অজুহাতে তিনি সামরিক বাহিনীতে হিজড়া সদস্য নিষিদ্ধ করেন।

১০. সাদা বাড়ি সামলাতে ভুল
সাবেক ব্যাংকার ও ব্যবসায়ী অ্যান্থনি স্কারামুচি নিয়োগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হোয়াইট হাউসের বিভিন্ন তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশের জন্য সাবেক প্রেস সেক্রেটারি শেন স্পাইসার, অনৈক্য ও বিশৃঙ্খলার জন্য প্রশাসনিক প্রধান কর্মকর্তা রেইন্স প্রিবাসকে দায়ী করে প্রেসিডেন্টের কাছে অভিযোগ দাখিল করেন। ট্রাম্প অভিযুক্তদের প্রতি অসন্তুষ্ট হলে স্পাইসার ও প্রিবাস ট্রাম্পের প্রতি আনুগত্য রেখেই পদত্যাগ করেন। তাদের স্কারামুচিকে যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক ও জেনারেল জন এফ কেলিকে প্রধান কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। পরে স্কারামুচির অশ্লীল কথাবার্তা ও অসৌজন্যমূলক আচরণের দায়ে ১০ দিনের মাথায় জেনারেল কেলির পরামর্শে ট্রাম্প তাকে অপসারণ করেন। সম্পাদনা : রাশিদ