রতনে রতন চেনে!

 

ফাহমিদা হক : প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একসময় বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সুনামের দিক থেকে ওপরের দিকে থাকলেও এখন আর সে অবস্থা নেই। এশিয়ার মধ্যেও বিশ্ববিদ্যালয়টির মান অনেক নিচের দিকে। বিশ্ববিদ্যালয়টির একসময়কার গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য এখন ইতিহাসের পাতায়। ছাত্র, শিক্ষক, সরকার সবাই মিলেই এর জন্য দায়ী। মানুষ এখন আর এই প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টদের ওপর ভরসা রাখে না, তাদের নিয়ে স্বপ্ন দেখে না। কেননা সেই স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নের নাম। এখন এখানে এমন সব ঘটনা ঘটছে, যা শুধু জাতীয় কলংকের তীব্রতাই বাড়িয়ে তুলছে। যার ফলে আগের মতো আর বিদেশি ছাত্ররাও এখানে পড়তে আসে না। কারণ, এরা এখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় অনিয়ম-অব্যবস্থা সম্পর্কে গণমাধ্যম সূত্রে সম্যক ওয়াকিবহাল। এরা ভাল করেই জানেন, এ বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন চলে শুধু ক্ষমতাসীনদের অশুভ দলবাজি। ফলে থেমে থেমে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস বন্ধ হয়ে যায়। এতে পড়াশোনার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। পড়াশোনার মান আশঙ্কাজনক নেমে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে দুষ্টগ্রহ হিসেবে কাজ করে দলবাজির মাধ্যমে ক্ষমতাসীনদের অনুগত অযোগ্য লোকদের শিক্ষক হিসেবে যখন-তখন নিয়োগ দেওয়া। যার ফলে এ নিয়ে ঝড় উঠেছে সারাদেশজুড়ে। ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী ঢাকা, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু সিনেট নির্বাচনের মাধ্যমে উপাচার্য প্যানেল তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এছাড়া প্যানেল তৈরি হলেও এক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ রয়েই যাচ্ছে। আর সবকিছুই চলে সরকারের চোখের সামনে দিয়েই। এই অনিয়মের বিরুদ্ধে কোনো সরকারের আমলেই ব্যবস্থা নেওয়া হয় না আর এর প্রতিকারও হয় না কোনোভাবেই। বরং বলা যায় সরকারের প্রচ্ছন্ন আশীর্বাদেই এ ঘটনা ঘটছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, দেশের সর্বোচ্চ এ বিদ্যাপীঠে এখন শিক্ষক রয়েছেন ১ হাজার ৯৯২ জন। বর্তমান ভিসি ২০০৯ সালে নিয়োগ পাওয়ার পর তার সাড়ে আট বছরের মেয়াদে ৯০৭ জন নিয়োগ পেয়েছেন। এর মধ্যে শেষ ৩ বছরে নিয়োগ হয়েছে ৩৫০ জন। অনুসন্ধানে জানা যায়, এই তিন বছরের নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল এবং যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দিয়ে নেওয়া হয়েছে অন্তত ৭৮ জনকে। দুই বিভাগে ১০ জন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ন্যূনতম যোগ্যতা পূরণ না করেই। এছাড়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা সংখ্যার চেয়ে অতিরিক্ত হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মোট ৪১ জন শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় স্নাতকোত্তর ছাড়াও নিয়োগ হয়েছে কমপক্ষে তিনজনের।
অনুসন্ধান বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষমতাসীনদের সমর্থক শিক্ষকদের সংগঠন নীল দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব এই অনিয়মের পেছনে ভূমিকা রাখছে বেশি। দুভাগে বিভক্ত নীল দলের একাংশের নেতৃত্বে আছেন ভিসি আরেফিন সিদ্দিক, আরেক অংশের নেতৃত্বে বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি এ এস এম মাকসুদ কামালসহ নীল দলের সিনিয়র কিছু নেতা। মূলত তৃতীয় মেয়াদে ভিসি হওয়াকে সামনে রেখে নীল দলের দুই অংশের দ্বন্দ্ব চরমে ওঠে। নিজেদের মধ্যে এই কোন্দলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে। প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়, গত ১২ জুলাই ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের আন্তর্জাতিক ব্যবসায় বিভাগে দুটি স্থায়ী ও তিনটি অস্থায়ী পদের জন্য মোট ৯ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু নিযোগপ্রাপ্তদের ৬ জনের আবেদন করারই ন্যূনতম যোগ্যতা ছিল না। স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে প্রথম দিকের ফলাফলধারীদের অগ্রাধিকারের কথা থাকলেও যোগ্যতা শিথিল করে ৩.৭৫ চাওয়া হয়। অথচ নিয়োগপ্রাপ্ত নয়জনের ফল বলছে তারা ৩.৬১ থেকে ৩.৭১ পর্যন্ত পেয়েছেন। এভাবে গত বছরে আগস্টে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগে, তারপরে আবার অক্টোবরে ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগে নিয়োগপ্রাপ্ত ৯ জনের মধ্যে নজিরবিহীনভাবে ৩ জন নিয়োগ পান স্নাতকাত্তর ডিগ্রি ছাড়াই।
এই অনিয়মে যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত সাধারণ শিক্ষকদের উদ্বিগ্ন করছে তেমনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের প্রধান বিচারপতিও। বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা প্রথম শ্রেণিতে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হতেন তাদেরকে নিয়োগ দেওয়া হতো আগে, এটা একজন সাবেক ভিসি নাম উল্লেখ না করার শর্তে বলেছেন। এবং এটাই ছিল সঠিক পদ্ধতি যোগ্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে। কিন্তু এখন আর তা হচ্ছে না সঠিকভাবে। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য এখন কেবল অনেকের স্মৃতিতেই সীমাবদ্ধ। আর এর জন্য সরকারই মুখ্যভাবে দায়ী, সরকারকেই এই অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ বের করতে হবে। কারণ যোগ্য লোককে অবহেলা করে অযোগ্যদের গুরুদায়িত্ব দিলে যা হয় তাই হয়েছে। একমাত্র রাজনৈতিক আনুগত্য ছাড়া দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের প্রধান ব্যক্তির শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ নানান ক্রিয়াকর্ম নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন রয়েছে। অনেক মুখরোচক কথাবার্তাও চালু রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে। শিক্ষক নিয়োগের হালচাল দেখে মজা করে অনেকেই বলেন, রতনে রতন চেনে।
লেখক: পরিচালক, সিসিএন