বাকশাল বিতর্ক সমাচার

 

অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন : বঙ্গবন্ধুর বাকশাল নিয়ে নানাবিধ তথ্যহীন অসার বিতর্ক আছে। এই বাকশাল প্রতিষ্ঠার পটভূমি, লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য যদি আমরা বস্তুনিষ্ঠ প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করি, তাহলে বিতর্কটির অবসান হবে। পটভূমিতে আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে, সে সময় বাংলাদেশে একটা দারুণ অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছিল। যারা হঠকারি রাজনীতির ধারক এবং বাহক ছিল, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের নামে খুন, লুণ্ঠন ইত্যাদি চলছিল সারা বাংলাদেশে। সাধারণভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে এই ধরনের দৃষ্টান্ত রহিত অপরাধ মোকাবিলা করা খুব কঠিন হয়ে পড়ছিল। বুঝা যাচ্ছিল যে, পরিস্থিতি ক্রমেই আয়ত্বের বাইরে চলে যাচ্ছে। এমন একটা প্রেক্ষাপটে, বাকশাল ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল। তবে আমি কোনো সময় বাকশাল ব্যবস্থাটিকে এক দলীয় ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করিনি।
তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে এই ব্যবস্থাটিকে আমি বলি যে, পরিস্থিতি অনিবার্যতায় একটি অভিন্ন জাতীয় মঞ্চ তৈরি করার প্রয়োজন ছিল এবং সেটাই ছিল বাকশাল। বাকশাল নিয়ে বিতর্কের অবকাশ এজন্য যে, বঙ্গবন্ধু আজীবন গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন। সেই বঙ্গবন্ধুই আবার অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন, সর্বময় ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে নিলেন। সেদিক থেকে সমালোচনার স্থানটি নিশ্চয়ই যুক্তিযুক্ত। কিন্তু এই যে পটভূমির কথা বললাম, সেটাও কিন্তু বিবেচনার অধিকার রাখে। উপরন্তু বঙ্গবন্ধুর জবানিতে এমন তথ্য আছে যে, বাকশাল তিনি সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে প্রবর্তন করেছিলেন। পরিস্থিতি উন্নত হলে তিনি আবার পুরনো ব্যবস্থায় অর্থাৎ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তনের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। এই বিষয়ে অকাট্য তথ্যটি এসেছে বঙ্গবন্ধুর অর্থমন্ত্রী প্রয়াত ইতিহাসবিদ ড. এ আর মল্লিকের বক্তব্য থেকে। আমি নিজেই ড. এ আর মল্লিকের কাছ থেকে শুনেছি যে, তিনি বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলেন।
এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের ইচ্ছা, বঙ্গবন্ধু উত্তর দিয়েছিলেন ডাক্তার সাহেব পরিস্থিতি দেখছেন না? আমাকে কয়টা দিন সময় দিন। আমি আবার আমার গণতন্ত্রে ফিরে যাব। পরিস্থিতি সামাল দিতে আমি বাধ্য । কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, যে ব্যবস্থাটি সাময়িক ছিল, সেই ব্যবস্থাটি চূড়ান্ত পর্যায়ে যাবার আগেই এই ব্যবস্থাটির স্রষ্টা বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। যার ফলে বঙ্গবন্ধুর সেই উচ্চারিত যে অঙ্গীকার, তা বাস্তবায়নের সময়টি আর থাকেনি। উপরন্তু মনে রাখতে হবে, বাকশাল আমলে বাংলাদেশের যাবতীয় সুযোগ ছিল উর্ধ্বগামী। তা প্রশাসনে বলি আর অর্থনীতিতে বলি, সবদিক থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসতে শুরু করেছিল। সেই মুহূর্তে তাকে হত্যা করা হয়। কাজেই বাকশাল আপাতত দৃষ্টিতে অগণতান্ত্রিক একটি পদ্ধতি হলেও এই পদ্ধতির অধীনেই বাংলাদেশের উর্ধ্বগামী সুযোগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। অবশ্যই তার অর্থ এই নয় যে, অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কোনোভাবেই সমর্থন করা যায়। সেটা বঙ্গবন্ধু করেননি। সেই প্রমাণ তো দেওয়া হল।
আমি একটি ঐতিহাসিক তুলনার মাধ্যমে এই বাকশাল ব্যবস্থার মূল্যায়ন করতে চাই। আমাদের জানা আছে যে, বলসেভিক বিপ্লবী নেতা লেনিন দ্রুতগতিতে সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবার জন্য যে প্রকল্প গ্রহণ করেছিলেন, তাকে বলা হয়েছে ‘ওয়ার কমিউনিজম’ অর্থাৎ কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার জন্যে যুদ্ধের মতো কর্মকান্ড চালিয়ে যেতে হবে দ্রুতগতিতে। এমনটাই ছিল ধারণা ওয়ার্ক কমিউনিজমে। কিন্তু ১৯২১ সালের মধ্যে গোটা সোভিয়েত ইউনিয়নের পরিস্থিতি বেসামাল হয়ে যায়। দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। সৈনিক বিদ্রোহ দেখা দেয়। আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি ভেঙে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে লেনিন দলের দশম কংগ্রেসে একটি নতুন সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি নতুন নীতি চালু করলেন। যার নাম হচ্ছে ‘নতুন অর্থনীতিক নীতি’ ইংরেজিতে বললে ‘নিউ ইকোনমিক পলিসি’। নিউ ইকোনমিক পলিসি বা নতুন অর্থনীতিক নীতির বৈশিষ্ট্য ছিল ‘মিশ্র’। এখানে পুঁজিবাদ এবং সমাজতন্ত্র পাশাপাশি ছিল অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়নকে সমাজতন্ত্রের উপযোগী করে গড়ে তোলবার জন্যই পুঁজিবাদি পটভূমি তৈরি করবার প্রয়োজনীয়তা ছিল। এমনকি লেনিন নিজেই জার্মানি থেকে পুঁজি বিনিয়োগকারীদেরকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নে বিনিয়োগ করার জন্যে। এই নীতিকে বলা হয় লেনিনের ‘কৌশলগত পশ্চাৎ প্রসারণী’। ইংরেজিতে হচ্ছে, ‘স্ট্র্যাটেজিক রিট্রিট’।
এ নীতির ফলে দেখা গেল ১৯২৮ সালের মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ঘুরে দাঁড়ায়। খাদ্য ঘাটতির দেশ হয়ে গেল খাদ্য উৎপত্তির দেশ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেল। তারপরে কিন্তু আবার সোভিয়েত ইউনিয়ন পুরনো পদ্ধতিতে ফিরে যায়। ইতোমধ্যে ১৯২৪ সালে লেনিন লোকান্তরিত হয়েছে। কিন্তু তার লোকান্তরের পরও তার নীতি অব্যাহত ছিল। যদি না থাকত তাহলে সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ত। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, কৌশলগত পশ্চাৎ প্রসারণের কারণে লেনিন যদি সমালোচিত না হন, বঙ্গবন্ধু একই ধরনের কৌশলগত পশ্চাৎ প্রসারণ করার কারণে তাকে সমালোচনা করা হবে কেন? যারা সমালোচনা করেন, তাদের কাছে তথ্য যুক্তি হাজির নেই বলে করেন। আবেগপ্রসূত অবস্থান থেকে সমালোচনা করেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, যদি সুযোগ দেওয়া যেত, বাকশাল ব্যবস্থা সাময়িকভাবে প্রবর্তন করে, তারপরে বাংলাদেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে, যদি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া যেত, তাহলে এই সমালোচনার কোনো অবকাশ থাকতো না। এই সুযোগ তাকে দেওয়া যেত। কিন্তু সমস্যাটা হয়ে গেল যে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলো ১৯৭৫’র ১৫ আগস্ট এবং তার সঙ্গে বাকশালের পতন হলো, মৃত্যু হলো।
আর তারপর থেকে তো বাংলাদেশে যে পরিস্থিতি হয়েছিল সেটি তো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লঙ্ঘন কোনো পরিস্থিতি নয়। বাংলাদেশকে পাকিস্তানিকরণ শুরু হয়েছিল। শুরু হয়েছিল বাংলাদেশে রাজাকারায়ন। অর্থাৎ পাকিস্তানি রাষ্ট্র কাঠামোর যাবতীয় বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশ ধারণ করতে শুরু করল। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী রাজাকারা বাসস্থান করতে শুরু করল। সুতরাং বলা যায় যে, ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টেই মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের এক সাময়িক মৃত্যু হয়েছিল। সাময়িক মৃত্যু এজন্য বলছি ১৯৯৬ পর থেকে বাংলাদেশ আবার মুক্তিযুদ্ধের পথে যেতে শুরু করেছে। তবে কতটুকু গিয়েছে বা না গিয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তা সত্ত্বেও মোটা দাগে বলা যায়, বাংলাদেশ ফিরেছে মুক্তিযুদ্ধের দিকে। সুতরাং বাকশাল সংক্রান্ত বিতর্কে যে তথ্য এবং প্রমাণ হাজির নেই সেটা বলা যায়।
পরিচিতি: ইতিহাসবিদ
মতামত গ্রহণ: সাইফুল ইসলাম