চীন-ভারত উত্তেজনা : সমাধান কোনপথে?

 

ড. দেলোয়ার হোসেন : চীন এবং ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ভূখ-গত বা সীমান্তগত সমস্যা রয়েছে। তবে আমরা জানি যে পঞ্চাশের দশকে তাদের নিজেদের মধ্যে পরস্পরের সহযোগিতা ও সুসম্পর্ক ছিল। পরবর্তীতে ১৯৬২ সালে সীমান্ত যুদ্ধে তাদের সে সম্পর্কে ফাটল ধরে এবং সম্পর্কের অবনতি ঘটে। যদিও তাদের মাঝে আবার ১৯৯০ দিকে সুসম্পর্ক তৈরি হয়। সীমান্ত নিয়ে তাদের যে সমস্যা রয়েছে সেটা ছোটখাটো কোনো সমস্যা নয়, সেটা দুদেশের মধ্যে বড় ধরনের সীমান্ত সমস্যা। অরুণাচলের মতো বিশাল ভূখ- চীনের ছিল বলে জোর দাবি করছে চীন কর্তৃপক্ষ। আবার ভারতও চীনের ভেতরে কিছু অংশ নিজেদের বলে দাবি করে আসছে।
আমার এখন যে বিষয়টি মনে হচ্ছে তা হলোÑ তিব্বত বা তিব্বতের ধর্মীয় নেতা দালাইলামা এবং আরও কিছু বিষয় নিয়ে তাদের মাঝে একটা মতবিরোধ আছে। এগুলোকে পাশ কাটিয়েই তারা দীর্ঘদিন ধরে সম্পর্কটা ধরে রেখেছে। একমাসের বেশি সময় ধরে সিকিমের ডোকলাম অঞ্চলে দুদেশের সৈন্যদের উপস্থিতিতে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেয়েছ। চীন বলছে, ভারত তাদের সীমান্তে ঢুকে গেছে এবং সেখানে কিছু স্থাপনাও তৈরি করেছে। আবার ভারত বলছে, চীন তার সীমান্তেও স্থাপনা তৈরি করছে আবার ডোকলাম অঞ্চলেও স্থাপনা নির্মাণ করছে। এখন আমার কাছে প্রকৃত বিষয় মনে হচ্ছেÑ যেহেতু তাদের মাঝে এখন আধিপত্য বিস্তারের একটা লড়াই এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। আধিপত্য বিস্তারটা যেমন আঞ্চলিক পর্যায় ও তেমনি বৈশ্বিক পর্যায়েরও। চীন ও ভারত যেমন তাদের প্রভাব বিস্তার এবং প্রভাব বলয় বৃদ্ধি করার চেষ্টা করছে। ঠিক তেমনি তাদের চেষ্টা আধিপত্য বিস্তারকে আরও সুসংহত করা। আমি মনে করি, এগুলোর জন্য তাদের যে একটা বিশাল সমরশক্তি আছে এবং তারা যে একটা শক্তিশালী পক্ষ। তারা যে কতটা শক্তিশালী সেটা প্রমাণ করার জন্যই সীমান্তকে ব্যবহার করছে। এ দুটি দেশ সীমান্তের উত্তেজনাটাকে তৈরি করছে এবং তারা সেটাকে ব্যবহার করছে। একটা নির্দিষ্ট আকার বা সময় পর্যন্ত তারা হয়তো সীমান্ত উত্তেজনাকে কন্টিনিউ করবে। তাদের মাঝে একটা স্নায়ু পরীক্ষা হচ্ছে। তাদের সে স্নায়ু পরীক্ষায় কে উত্তীর্ণ হবে সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে আমার মনে হয় একটা পর্যায়ে তারা তাদের অবস্থান থেকে সরে আসবে। সামনে চীনে ব্রিকসের সম্মেলন আছে। এ সম্মেলন উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চীনে যাবেন। সেখানে হয়তো সীমান্ত সমস্যা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
আমরা ডোকলাম অঞ্চল নিয়ে যে উত্তেজনা দেখছি আমার মনে হয়, তারা নিজেরাও জানে যে তারা কী কাজ করছে। যে অংশটাকে বিরোধপূর্ণ বলা হচ্ছে, সেটা নিয়ে রয়েছে ভারত এবং চীনের একেবারই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। ফলে বৃহৎ দুটি দেশের দৃষ্টিভঙ্গি এবং যে তৎপরতা এই তৎপরতার ফলে তারা এত ক্ষুদ্র একটা জায়গায় নিয়ে যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। কোনো কারণে এই উত্তেজনা যদি দীর্ঘদিন কন্টিনিউ করে তাহলে বুঝতে হবে, এই উত্তেজনা বৃদ্ধির পেছনে অন্য কোনো স্বার্থ জড়িত আছে। তারা তাদের মর্যাদা, অবস্থান এবং ইস্যুগুলো নিয়ে তারা যে উদ্বিগ্ন এটা বিশ্বকে দেখাতে চায়। অন্য দেশগুলোকে তারা সিগন্যাল দিচ্ছে যে আমরা অনেক বেশি শক্তিশালী। আজকে তাদের যে সমস্যাগুলো সেটার অনেকটা ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়েছে। যখন তারা মনে করবে তাদের গোল অর্জন হয়ে গেয়েছে। তখন তারা এই সীমান্ত থেকে আস্তে আস্তে সরে আসবে। আমি মনে করি, তাদের মাঝে যতই উত্তেজনা বিরাজ করুক না কেন, সামরিক হামলার দিকে যাবে না। এবং তারা জানে যে আমরা হামলা করলে তারাও সেটার পাল্টা হামলা করবে। সেক্ষেত্রে দুজনেরই ক্ষতি হতে পারে। তবে তাদের এই উত্তেজনা হ্রাস করার জন্য রাশিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে ভূমিকা পালন করতে পারে।
পরিচিতি: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক
মতামত গ্রহণ: বায়েজিদ হোসাইন
সম্পাদনা: আশিক রহমান