শাহজালালে সিএসও‘র বয়স ও সনদ প্রতারণা!

এইচএম দেলোয়ার : হযরত শাহজালার বিমানবন্দরে কর্মরত প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্ত (সিএসও) রাশিদা সুলতানার বয়স ও শিক্ষা সনদ প্রতারণার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তার (সিএসও) একাডেমিক শিক্ষা সনদে জন্ম তারিখ- ৫-৯-১৯৬৬, পাসপোর্টে জন্ম তারিখ ৫-৯-১৯৭১ এবং জাতীয় পরিচয় পত্র (এনআইডি)তে জন্ম তারিখ ৫-৯-১৯৬৬।
শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রেও রাশিদা সুলতানা প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন। দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার মহিলা পাতা সুরঞ্জনায় তার দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীন টাংগাইল বিন্দুবাসিনী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৮৪ সালে এসএসসি পাস করার কথা বললেও প্রকৃত পক্ষে তিনি ১৯৮৪ সালে টাংগাইলের বিন্দুবাসিনী বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেননি এবং পাসও করেননি বলে নিশ্চিত করেছেন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তার প্রকাশিত ওই সাক্ষাৎকারে তিনি ঢাকা বিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্র বিজ্ঞানে ১৯৯৫ সালে বিএসএস ও ১৯৯৬ সালে এমএসএস পাস করার কথা স্বীকার করেছেন। কিন্ত অনুসন্ধ্যানে জানা যায়, ১৯৯৫ ও ১৯৯৬ সালে তিনি বিএসএস ও এমএসএস পাস করেননি। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের দুটি শিক্ষা সনদ আমাদের হাতে এসেছে। তাতে দেখা যায়, ১৯৮৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে বিএসএস এবং ১৯৯০ সালে তিনি একই বিশ^বিদ্যালয় থেকে এমএসএস পাস করেছেন।
অনুসন্ধ্যানে আরো জানা যায়, শাহজালাল বিমানবন্দরে কর্মরত প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা (সিএসও) ১৯৮৩ সালে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীন গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর থানার সাবের মিঞা জছিমুদ্দিন বহু: উচ্চ বিদ্যালয় হতে এসএসসি পাস করেছেন। তার পরীক্ষার রোল মুকসুদ নম্বর-ম-৪৪৬৫৪, রেজি নম্বর-৭৪৮৩৯/১৯৮১, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের ক্রমিকনং-১৮৭৫২, এই শিক্ষা সনদে তার জন্ম তারিখ ৫-৯-১৯৬৬।
প্রশ্ন ওঠেছে সিএসও রাশিদা কি প্রকৃত শিক্ষা সনদ দিয়ে চাকরি করছেন নাকি জাল শিক্ষা সনদে চাকরি করছেন নাকি শিক্ষা সনদ প্রতারণা করে চাকরি করছেন। অথচ তিনি এভাবেই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো দেশের একটি প্রধান বিমানবন্দরে কর্মরত নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে একটানা ১৯ বছর যাবত চাকরি করছেন।
রাশিদা সুলতানার একটি জাতীয় দৈনিকে (যুগান্তর, ২৩ জানুয়ারি ২০১৭ সংখ্যা) প্রকাশিত সাক্ষাৎকারেই শিক্ষা সনদের জাল বা ভুয়া কিংবা প্রতারণার বিষয়টি উঠে এসেছে। তিনি ওই সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে, তিনি (রাশিদা ) ১৯৮৪ সালে টাংগাইলের বিন্দুবাসিনী স্কুুল থেকে এসএসসি পাশ করেছেন। কিন্তু বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানান, ১৯৮৪ সালে রাশিদা সুলতানা (পিতা- মহি উদ্দিন মোল্লা) নামে কোন শিক্ষার্থী ১৯৮৪ সালে বিন্দুবাসিনী স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেনি এবং পাসও করেনি। কাজেই এ ক্ষেত্রে রাশিদা সুলতানার পত্রিকায় প্রকাশিত সাক্ষাৎকরেই পরিস্কার হচ্ছে যে, তিনি ( রাশিদা) জাল সনদে অথবা প্রতারনা করে ১৯৯৮ সালের ১১ আগস্ট সিভিল এভিয়েশনে নিরাপত্তা কর্মকর্তা পদে শাহজালাল বিমানবন্দরে চাকরিতে যোগদান করেছেন। কারণ তিনি তো ওই স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেননি এবং পাসও করেননি। তাহলে তিনি কিভাবে এ্ইচএসসি , বিএসএস, এমএসএস পাস করলেন ? আর কি ভাবে সিএএবির চাকরিতে বয়স মার্জনায় যোগদান করলেন ?
সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক একান্ত সচিক র.আ.ম. ওবায়দুল মুক্তাদির চৌধুরির সুপারিশে মুক্তিযোদ্বার সন্তান হিসেবে বয়স মার্জনায় রাশিদা সুলতানাকে নিরাপত্তা কর্মকর্তা পদে সিএএবিতে ১৯৯৮ সালে ১১ আগস্ট চাকরিতে নিয়োগ দেয়া হয় এবং ১৯ আগস্ট তিনি শাহজালাল বিমানবন্দরে যোগদান করেন। বয়স মার্জনার ওই দাপ্তরিক চিঠিতে প্রধানমন্ত্রীর ‘সায়’ রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, শাহজালাল বিমানবন্দরের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা রাশিদা সুলতানার পাসপোর্টে তার জন্ম তারিখ ৫-৯-১৯৭১। সে হিসাবে তার চাকরিতে যোগদানের তারিখ ১১-৮-১৯৯৮-তে বয়স হয় ২৭ বছরের ওপরে। তাহলে তো চাকরির ক্ষেত্রে তার (রাশিদা) বয়স মার্জনার প্রয়োজনই পড়ে না। কারন তার বয়স তো ৩০ বছরই অতিক্রম করেনি। তাহলে কেন তাকে ( রাশিদা) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন একান্ত সচিবের সুপারিশে বয়স মাজনায় চাকরি দেয়া হলো ? বিষয়টি রহস্যজনক নয় কি? আবার ১৯৮৩ সালের শিক্ষা সনদে তার জন্ম তারিখ ৫-৯-১৯৬৬, এ ক্ষেত্রে তার বয়স ৩২ বছর ৯ দিন। এ ক্ষেতে তার বয়স চাকরির ক্ষেত্রে অতিক্রম করে। তাহলে কোনটি তার তার আসল বয়স? রাশিদা সুলতানা যুগান্তর পত্রিকায় ওই সাক্ষাৎকারে আরো বলেছেন, তার বয়স ৩০ থেকে কয়েক মাস অতিক্রম করায় তার নিয়োগ আটকে গেল। কিন্ত দেখা যায় , তার জন্ম তারিখ ৫-৯-১৯৬৬ হলে তার বয়স ১৯৯৮ সালে ৩২ বছর ৯ দিন হয়। আবার তার বয়স ৫-৯-১৯৭১ হলে তার বয়স হয় ২৭ বছর। তাহলে তার জন্ম তারিখ কোনটি সঠিক পাসপোর্টের না এনআইডির নাকি শিক্ষা সনদের? তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মতো কয়বার জন্মগ্রহন করেছেনÑ এ প্রশ্ন আজ সিএএবিসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ঘুরপাক খাচ্ছে।
রাশিদা সুলতানা জাতীয় দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে বলেছেন,‘লিখিত পরীক্ষায় ভাল ফলাফল করলেও বয়স ৩০ বছরের একটু ওপরে হওয়ায় তার নিয়োগ আটকে গেল। বিষয়টি তাকে ভাবিয়ে তোলে। সেই ভাবনা থেকেই মুক্তিযোদ্বা সন্তানদের পক্ষ হয়ে চাকরির ক্ষেত্রে বয়স ৩২ বছর করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেন। প্রধানমন্ত্রী তার আবেদনে সাড়া দিয়ে মুক্তিযোদ্বার সন্তানদের চাকরির বয়স ৩২ নির্ধারন করেন।
চাকরির ক্ষেত্রে বয়স অতিক্রম করলে তো কোন ব্যক্তি সরকারী চাকরিতে আবেদনই করতে পারবেন না। এ ক্ষেত্রে রাশিদা সুলতানা কিভাবে সিএএবিতে চাকরির আবেদন করলেন, আর কিভাবে তিনি লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করলেন। আর তার আবেদন তো বাছাইয়ের সময় সিএএবি কর্তৃপক্ষের গ্রহন বা অনুমোদনের কথা নয়।
ঘবি উড়প ৭থ১সাক্ষাৎকারের আরেক জায়গায় রাশিদা সুলতানা বলেছেন, ‘টাংগাইল বিন্দুবাসিনী স্কুল থেকে ১৯৮৪ সালে এসএসসি, আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে ১৯৮৬ সালে এইচএসসি, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্র বিজ্ঞানে ১৯৯৫ সালে বিএসএস এবং ১৯৯৬ সালে এমএসএস করেন।’
সূত্র মতে, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক উপদেষ্টা ড. এসএ মালেকের সুপারিশে বয়স মার্জনায় রাশিদা সুলতানাকে সিএএবিতে চাকরি দেয়া হয় বলে সিএএবিতে বিষয়টি বেশ চাউর হয়ে গেছে।
বিষয়টি জানার জন্য সিএসও রাশিদা সুলতানার সেল ফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, ‘বয়স মার্জনায় রাশিদার চাকরি, চোরাচালানির অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রীর ভিভিআইপি মুভমেন্টে সিএসও রাশিদা লাপাত্তা, প্রত্যাহারের সুপারিশের পরও রাশিদা বহাল’, ‘শাহজালালে সিএসওকে প্রত্যাহারে মন্ত্রনালয়ে অভিযোগ’ শিরোনামে পত্রপত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পরও সিএএবি কর্তৃপক্ষ সিএসও রাশিদার ব্যাপারে এখনও পর্যন্ত কোন প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহন করেনি বলে জানা গেছে। তিনি ( রাশিদা ) মুক্তিযোদ্বার সন্তান দাবি করলেও মুক্তিযোদ্বা গেজেটে তার পিতার নাম মহিউদ্দিন মোল্লার নাম নেই বলে জানা গেছে। তার বাবার নাম মুক্তিযোদ্বার তালিকায় ওঠনোর জন্য তদবির করা হচ্ছে বলেও শোন যায়।
সংযোগ: যুগান্তর পত্রিকার সাক্ষাৎকার, এনআইডির ফটোকপি, পাসপোর্টের ফটোকপি, মুকসুদপুর সাবের মিঞা জছিমুদ্দিন বহু: উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পাসকৃত এসএসসি সনদের ফটোকপি, বয়স মার্জনায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক একান্ত সচিবের স্বাক্ষরিত পত্রের ফটোকপি