ভাষা আন্দোলনের প্রথম গানের গীতিকার অধ্যাপক আনিসুল হক চৌধুরী

উম্মুল ওয়ারা সুইটি : ভাষা আন্দোলনের শুরু থেকেই ছিল ভাষার গান। ১৯৪৮ সালে যখন ভাষা আন্দোলনের প্রথম সূচনা হয় তখন থেকে গনসংগীতের মাধ্যমে আন্দোলন চলছিল। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তীব্র আন্দোলন ও বাঙালির আত্মাহুতির মধ্য দিয়ে যখন বাংলা ভাষা বাংলার মানুষের ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেল তখন থেকেই ভাষার গান নতুন মাত্রা পায়। সাংবাদিক ও লেখক আবদুল গাফফা চৌধুরীর লেখা আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো গানটি একুশের গান হিসেবে সুপরিচিত।
তবে ভাষা আন্দোলন নিয়ে প্রথম গান রচিত হয় ১৯৪৮ সালে। গানটির গীতিকার অধ্যাপক আনিসুল হক চৌধুরী। তিনি ছিলেন একজন কবি। গানািটতে সুর করেন খ্যাতিমান সুরকার ও গুসংগীত শিল্পী শেখ লুৎফর রহমান। গানটির কথা হলো- শোনেন হুজুর/বাঘের জাত এই বাঙালেরা/জান দিতে ডরায় না তারা/তাদের দাবি বাংলা ভাষা/আদায় করে নেবে ভাই।
ভাষা আন্দোলন নিয়ে লেখা ভাষা সৈনিক গাজিউল হকের একাত্তরের স্মৃতিচারণ ও ভাষা আন্দোলনের উপর বিভিন্ন লেখা এবং প্রখ্যাত রবীন্দ্র সংঙ্গীত শিল্পী কলিম শরাফীর স্মৃতিচারণ থেকে এই তথ্য জানা যায়।
জানা গেছে, অধ্যাপক আনিসুল হক ১৯৪৮ সালে ঢাকা থেকে বাংলায় অনার্সসহ এম এ পাস করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়েই তিনি কবি ও গীতিকার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সে সময় তিনি বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রাম নিয়ে লিখেছেন। পাশাপাশি তিনি পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ঢাকা বেতারে তালিকাভূক্ত গীতিকার ছিলেন। শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ, আবদুল আলীম, আব্দুল লতিফসহ সব প্রতিষ্ঠিত শিল্পীই তার গান গেয়েছেন।
১৯৪৮ সালে যখন ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়, তখন তিনি বেশ কয়েকটি গান লিখেন। তার ঘনিষ্ট বন্ধু ও গনসংগীত শিল্পী শেখ লুৎফর রহমানকে তিনি দুটি গান দিয়েছিলেন। সেটি একদিনের মধ্যেই সুর করে রিহার্সেল করা হয়। আরও রচনা করেন, ভাই রে ভাই, বাংলাদেশে বাঙালি আর নাই। অনেকগুলো গণসংগীত রচনা করেন তিনি। এরমধ্যে রয়েছে, ঘুম ঘুম শুধু ঘুম পাড়ানী গান আজ নয় অন্যতম। সাগর পাড়ের দেশ, আমাদের হাজার নদীর দেশ এখনও অনেকের মন ছুঁয়ে আছে এসব গান তখন বিপ্লবীদের মুখে মুখে ছিল।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভীষ্মদেব চৌধুরী বলেন, ভাষা আন্দোলনের সময় অনেক গান রচিত হয়েছে। তখন কিভাবে আন্দোলন হতো সেটি আমাদের এই প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা উচিত। ভাষা সৈনিকরা এখনও কয়েকজন বেঁচে আছেন। পরবর্তী প্রজন্মকের তাদের সম্পর্কে ভালো করে জানাতে হবে। ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে রাষ্ট্রের পাশাপাশি ব্যাক্তিরও কাজ করা উচিত।
জানা গেছে, আনিসুল হক অনেক জনপ্রিয় আধুনিক গানেরও গীতিকার। তার লেখা কালজয়ী গান গুলোর মধ্যে অন্যতম হল মরমী শিল্পী আবদুল আলীমের গাওয়া রূপালী নদী রে, রূপ দেইখা তোর হইয়াছি পাগল। ময়নামতির শাড়ি দেব, গয়না দিব গায়-গানটি ছিল অনেক জনপ্রিয়। নদী ও নারী, ১৩ নং ফেকু ওস্তাগার লেন, সুখী পরিবারসহ বেশকিছু জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের গানও লিখেছেন তিনি। আনিসুল হক চৌধুরীর লেখা গবেষণাধর্মী বই বাংলার মুখ, গানের বই গানের ভরে মন এবং প্রবন্ধ নিশি ভোরের ফুল উল্লেখযোগ্য।