নাসিরনগর হামলা
পাঁচ কারণে প্রশাসনের পক্ষ নেন মন্ত্রী ছায়েদুল

bb-2-550x351রিকু আমির, নাসিরনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) থেকে : নাসিরনগরে হিন্দু বসতঘর ও মন্দিরে হামলা নিয়ে শাঁখের করাত পরিস্থিতি উদ্ভব হওয়ায় নাসিরনগরের সংসদ সদস্য ও মৎস্য-প্রাণীসম্পদ মন্ত্রী অ্যাড. ছায়েদুল হক প্রশাসনের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেন।
যেখানে ক্ষমতাসীন দলের কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী কিছু নেতা থেকে শুরু স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে পর্যন্ত অভিযোগ উঠে প্রশাসনের ব্যর্থতার।
আমাদের সময় ডটকমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, স্থানীয় প্রশাসন ছায়েদুল হকের অতিঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের চাপে পড়ে দুটি ইসলামভিত্তিক সংগঠনকে সমাবেশের অনুমতি দেয়। যেখান থেকে হিন্দু বসতবাড়ি-মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটে। এছাড়া প্রশাসনের কারও সঙ্গে ছায়েদুল হকের সম্পর্ক গড়ে উঠে পারিবারিক এর মতোই।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ২৯ অক্টোবর রসরাজের ফেসবুকের ঘটনা প্রকাশ পাবার পর এর প্রতিবাদে ৩০ অক্টোবর নাসিরনগর কলেজ মাঠে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত ও কথিত খাঁটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত নাসিরনগর আশুতোষ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে পৃথক দুটি সমাবেশ আহ্বান করে। সমাবেশ করতে দুটি সংগঠনই পৃথকভাবে ২৯ অক্টোবর বিকালে সদ্য সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী মোয়াজ্জেম আহমেদের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করেন। তিনি থানার সদ্য সাবেক ওসি আবদুল কাদেরের সঙ্গে আলোচনা করে সভার অনুমতি দেননি। এ নিয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রশাসনের সঙ্গে দুই সংগঠনের নেতা এবং মোবাইল ফোনের মাধ্যমে মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ দুই ব্যক্তি চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত এই অবস্থা চলতে থাকে আর মোবাইল ফোনে চাপাচাপি চলতে থাকে রাত ১২টা পর্যন্ত।
সূত্রগুলো বলছে- এসব চাপাচাপিতে পড়েই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দুই সংগঠনকে পৃথক সমাবেশের অনুমতি দেন ৩০ অক্টোবর সকালে। সব ঘটনা শুনে ওসি আবদুল কাদের উপজেলা নির্বাহী কর্র্মতাকে জানিয়েছিলেন, কোনো সমস্যা হবে না। ওসির যুক্তিতে নিশ্চিন্তে হাঁফ ছাড়েন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
সূত্র মতে- নাসিরনগর আশুতোষ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুর রহিম ও তার আপন ভাই সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল হাশেমই মোবাইল ফোনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে চাপাচাপি করেন। তারা শুধুমাত্র আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের সমাবেশের জন্য এই চাপাচাপি করেন। শুধুমাত্র এ সূত্র ধরে কথিত খাঁটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত একাট্টা হয়ে প্রশাসনকে চাপাচাপি শুরু করলে তারাও সমাবেশের অনুমতি লাভ করেন।
সূত্র বলছে, ওসি-ও রহিম ও হাশেমের কথায় তাদেরই পক্ষ হয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের সমাবেশের তদবির করেন। কোনো কিছু হবে না বলে নানা যুক্তি উপস্থাপন করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে আশ্বস্ত করেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আবুল হাশেম বিয়ে করেছেন মন্ত্রীর খুব কাছের চাচাত ভাইয়ের মেয়েকে। সে সূত্রে তিনি চেয়ারম্যান হন এবং ক্রমান্বয়ে মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সহচর হয়ে উঠেন। অন্যদিকে, ভাইয়ের শ্বশুরবাড়ির সুবাদে আবদুর রহিম ছায়েদুল হকের ঘনিষ্ঠতা অর্জন করতে সক্ষম হন। যদি ছায়েদুল হক বলতেন- প্রশাসন হামলার জন্য দায়ী, তবে প্রশাসন যদি সাংবাদিক বা অন্য কোনো স্পর্শকাতর স্থানে জানিয়ে দেয়, চাপাচাপিকারীদের কারণে এ সমাবেশের অনুমতি দেয়া হয়েছে, এসব চাপাচাপিকারী মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। তবে মন্ত্রী নিশ্চিত বিপদে পড়তেন। এ আশঙ্কা থেকে মন্ত্রী প্রশাসনের ব্যর্থতা স্বীকার করেননি।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ৪ বছর ধরে নাসিনগর থানার ওসির দায়িত্বে থাকা আবদুল কাদেরের সঙ্গে ছায়েদুল হকের সম্পর্ক খুবই গভীর হয়ে উঠেছিল। মন্ত্রীর পরিবারের একজন সদস্যের কারণে এ সম্পর্ক ছিল শক্তিশালী। প্রশাসনের ব্যর্থতা বললে, এসম্পর্ক নষ্ট হবে এবং ছায়েদুল হক বিশ্বস্ত ও শক্তিশালী শক্তি হারাবেন- এমন আশঙ্কা থেকে প্রশাসনের ব্যর্থতা স্বীকার করেননি।
এসব ছাড়াও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যে রকম চাপাচাপির শিকার হয়েছেন রহিম ও হাশেমের কাছ থেকে, সে রকম চাপাচাপির চেয়ে কম চাপাচাপির শিকার ওসি যদি কোনো স্পর্শকাতর স্থানে প্রকাশ করেন যে- মন্ত্রীর আত্মীয়দের চাপাচাপির জন্যই প্রশাসন দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। তবে নিশ্চিত বিপদের আশঙ্কা ছিল ছায়েদুল হকের। যেজন্য তিনি প্রশাসনের ব্যর্থতা স্বীকার করেননি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ওএসডি এবং ওসির প্রত্যাহার ঠেকাতে মন্ত্রী কিছুটা মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। যার মূল কারণ ছিল- মন্ত্রীর স্বজনদের কথা অনুযায়ী কাজ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ওসি ওএসডি-প্রত্যাহারের শিকার হলেন। যদি তাদের বদলি বাতিল না করা হয়, তবে মন্ত্রীর স্বজনদের চাপাচাপির কথা যদি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ওসি কোথাও ফাঁস করে দেয়- এমন আশঙ্কা থেকে।
আবার গত ৬ নভেম্বর ছায়েদুল হক আশুতোষ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ভবনে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নে দাবি করে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কোনো সমাবেশের অনুমতি দেননি।
সাংবাদিকরা এসময় জানতে চান- তারা ব্যক্তিগতভাবে এ নিয়ে উপজেলা নির্বার্হী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছেন, কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন- সমাবেশের অনুমতি দেয়ার কথা। আপনি বলছেন- অনুমতিই দেয়নি।
এসময় তিনি চড়া কণ্ঠে জানান, অনুমতি দেয়নি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। এসময় তিনি অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত নেতাকর্মীদের চড়া ভাষায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ফোন দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে আনতে নির্দেশ দেন।
অনুসন্ধানে জানা গেল- ছায়েদুল হক যদি স্বীকার করতেনও যে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনুমতি দিয়েছেন। তাহলে যদি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কোথাও ফাঁস করে দেন, অনুমতি দিতে বাধ্য হয়েছেন রহিম ও হাশেমের চাপাচাপিতে, তবে ছায়েদুল হক নিশ্চিত বিপদে পড়তেন।
৬ নভেম্বরের সংবাদ সম্মেলনে ছায়েদুল হক সাংবাদিকদের কাছে জোর স্বরে দাবি করেন- প্রশাসন তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছে। না করলে আরও ভয়াবহ অবস্থা হত।