এফডিসি নিয়ে মানুষের যে ধারণা সেটি আমার ভেঙে গেছে : শবনম বুবলি

IMG_2097-550x366বিনোদন ডেস্ক : (প্রিয়.কম) মেঘলা আকাশ। হিমেল হাওয়া বইছে। কিছুক্ষণপরেই বৃষ্টির রিনিঝিনি শব্দে মুখরিত হয়ে উঠবে চারপাশ। সম্প্রতি এমন এক দুপুরে বিএফডিসি যাওয়ার পথে প্রকৃতির এমনটাই দৃশ্য চোখে পড়ল। যদিও কিছুক্ষণবাদেই বৃষ্টির বদলে পূব আকাশে সূর্য হেসে উঠল। সাদা রংয়ের মেঘগুলো পাল তুলে দূর অকাশে কোন এক কোনে দৌড়ে চলে যাচ্ছে। প্রকৃতির এমন নানান রূপ দেখতেই দেখতেই চলে গন্তব্যে চলে আসলাম।
আর কথা ছিল ঠিক বিকেলের কিছুক্ষণ পরে কথা বলবেন সংবাদ পাঠিকা থেকে নায়িকা তকমা লাগানো ঢাকাই ছবির নবাগত নায়িকা শবনম বুবলি। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মেকআপ রুমে তার সাথে কিছুক্ষণ খুচরা আলাপ চলল। আর শেষে বললেন শর্ট রেডি সবাই তার অপেক্ষায় বসে আছেন। তড়িঘড়ি করে চলেন। এরপর যখন কথা শুরু হলো তখন সন্ধ্যা নেমেছে এ শহরে। মুখোমুখি হলাম ঢাকাই ছবির নবাগত নায়িকা শবনম বুবলির।
প্রিয় ডট কমের সাথে শবনম বুবলির সাক্ষাতকারটি আমাদের সময় ডট কমের জন্য তুলে ধরা হল।
প্রিয়.কম : দীর্ঘদিন সংবাদপাঠিকা হিসেবে কাজ করেছেন, এরপর হঠাৎ করেই বাংলা চলচ্চিত্রের নায়িকা। আপনার নায়িকা হয়ে ওঠার গল্পটা বলবেন কী?
শবনম বুবলি : আমার গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী হলেও জন্ম ঢাকায়। আমি অর্থনীতিতে অনার্স শেষ করে দু-বছর এলএলবি পড়েছি। তারপর আইনি পেশায় দাঁড়ি টেনে দিয়েছি। আর মাঝখানে অনার্স শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ করার জন্যে ভর্তি হয়েছিলাম। এখনও সেখানে কাজের ফাঁকে ফাঁকে ক্লাস করছি। সবকিছু মিলিয়ে আমার আর এলএলবি শেষ করা হয়নি। এরপর বেশখানিক সময় জনপ্রিয় একটি বেসরকারি টিভিতে চ্যানেলে নিউজ প্রেজেন্টার হিসেবে কাজ করেছি। এরপর হঠাৎ করেই ‘বসগিরি’ সিনেমার পরিচালক আর প্রযোজক আমার সাথে যোগাযোগ করেন।
আমি ছবিতে অভিনয় করব কি না? অনেক হিসেব নিকেশ কষে দেখলাম করা যায়। নতুন একটা মাধ্যম। তবে আমার যে কিছু শর্ত আছে সেগুলোও তাদের জানিয়ে দিলাম। এরপর থেকেই আমার সিনেমায় যাত্রা শুরু হয়েছে। তবে দারুণ আরেকটি বিষয় ঘটেছে, একটি ছবির শুটিং সম্পন্ন না হতেই এরপর ‘শুটার’ ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব পাই এবং চুক্তিবদ্ধ হই। এখানেও আমি শাকিব খানের বিপরীতে অভিনয় করছি। আমি নিজেকে অনেকটাই ভাগ্যবতী মনে করছি। অনেক কিছু শিখতে পারছি। সর্ম্পূণ টিমটাই আসলে দারুণ।
প্রিয়.কম: আচ্ছা পরিবার থেকে কি ধরনের সহযোগিতা পেয়েছেন, যখন তারা শুনেছেন আপনি ফিল্মের নায়িকা হিসেবে অভিনয় করতে যাচ্ছেন, তাদের প্রতিক্রিয়াটা কেমন ছিল?
শবনম বুবলি : আমি কিন্তু ভিন্ন একটা মাধ্যম থেকে এ পেশায় এসেছি। যার কারণে এ মাধ্যমে কাজের কোনো ধরনের পূর্ব অভিজ্ঞতা আমার নাই। আর আমার পরিবারের সাপোর্টটা খুবই কম। পরিবারের সকলেই চাচ্ছিলেন যেহেতু নিউজ প্রেজেন্টার হিসেবেই ভাল করছি সেখানেই ক্যারিয়ারের বাকিটা সময় কাটিয়ে দিই। তবে পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না বিধায় আমিও একটু দ্বিধা-দন্ধে ছিলাম। আর পরিচালক, প্রযোজকরাও একটু কনফিউজ ছিল আমি আসলে করতে পারব কি না? পরে যখন আমাকে গল্প শুনিয়েছে। কাজের পরিবেশের আমার বাবা মাকে বলেছেন তখন তারা রাজি হয়েছেন। আমারও তাই মনে হয় যে কোন মাধ্যমে কাজ করার ক্ষেত্রে কাজের পরিবেশ ভাল থাকটা গুরুত্বপূর্ণ। আর যদি ভাল না লাগত তাহলে এখানে শুরুর পরেই সমাপ্তি টানতে পারতাম।
প্রিয়.কম : আপনি একটা বিষয় বলছিলেন, অভিনয়ের বিষয়ে আপনার কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, তাহলে অভিনয়ের মাঠে নিজেকে কীভাবে সামলে নেন?
শবনম বুবলি : হ্যাঁ, সেটি সত্য। কাজের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বলতে সেরকম কোনো সার্টিফিকেট আমার কিন্তু নেই। বিভিন্ন দেশের ভাল ভাল ফিল্মগুলো দেখছি। আর যারা দক্ষ অভিনেতা-অভিনেত্রী তাদের সাথে তো প্রায়ই কথাবার্তা হয়। তারাও আমাকে বিভিন্ন খুঁটিনাটি বিষয়ে পরামর্শ দেন। আর শুটিংয়ের আগে কিংবা এক কিংবা দু-দিন আগে আমার পরিচালকের কাছ থেকে আমার চরিত্রের অংশটা বুঝে নিই। চিত্রনাট্যকারের কাছ থেকেও বিভিন্ন বিষয়ে আমি খুঁটিনাটি বুঝে নিচ্ছি। আর নাচের বিষয়টা হলো ছোটবেলায় নাচের সাথে সম্পৃক্তটা ছিল। মাঝখানে পড়াশোনা কিংবা চাকরির জন্যে বন্ধ ছিল। এখন আবার শুরু করেছি।
প্রিয়.কম : সিনেমার নায়িকাদের নিয়ে নানান নেতিবাচক কথা শোনা যায়, বিশেষ করে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার আগে। আপনি কী এধরনের কোনো নেতিবাচক প্রস্তাব পেয়েছিলেন?
শবনম বুবলি : ভাল-মন্দ তো সব জায়গাতেই আছে। মিডিয়ার প্রতি সকলেরই কম-বেশি আকর্ষণ আছে বিধায় সাধারণ মানুষ একটু বেশি জানতে চান। পান থেকে চুন খসে পড়ল কি না? আর দিন শেষে একটা নারী-পুরুষের বৈষম্য থেকেই যায়। আর যে যেখানেই থাকুক নেগিটিভ বিভিন্ন বিষয়গুলো কিন্তু মিডিয়ার বাইরেও হয়। সেটা প্রকাশিত হয় না বলে আমরা জানি না। যেটি বড় আকারে প্রকাশিত হয়, আমরা সেটা বড় করেই জানি। আর মিডিয়ার মানুষজন মনে একটু বেশিই ভাল থাকেন, কারণ তারা তাদের কাজটি সম্পর্কে সচেতন থাকেন।
মিডিয়ার কেউ নেতিবাচক কিছু করলেই সেটি প্রকাশিত হয়ে যাবে। তারা ওই বিষয়গুলোর বেশি খেয়াল রাখেন সবাই। আর নিজে ভাল থাকলে সবকিছু ভাল। আমি যদি চাই ভাল থাকব সেটি পৃথিবীর যেখানেই কাজ করি না কেন সম্ভব। আর আমি দুটি ছবিতে কাজের যে সুস্থ পরিবেশ পেয়েছি, তারপরও মানুষ কীভাবে যেন কাজের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেন।
প্রিয়.কম : একটা বিষয়, শুটিংয়ের সময় আপনার মধ্যে এক ধরনের উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা যায়, সেটি কি পেশাদারিত্বের কারণে, নাকি নতুন একটি মাধ্যমে কাজ করতে এসেছেন সেজন্যে?
শবনব বুবলি : উচ্ছ্বাসের কারণ আসলে আমি ভিন্ন একটি মাধ্যম থেকে এসেছি। আগে একটা ধারণা ছিল, না জানি কেমন হবে। ব্যাপারটা না জানি কেমন? এসে দেখলাম, আমার কাজের পরিবেশটা ভীষণ ভাল। আমার পরিবারের মতো করে আমাকে সবাই কেয়ার করছেন। আমাকে বলা হচ্ছে, কাল আপনার কল টাইম এতটায়। আমি এসে মেকআপ নিলাম এরপর ডাকল শুটিং শুরু। তারপর প্যাকআপ।
তারপর বাসায় যাওয়া। বাংলা সিনেমা কিংবা এফডিসি নিয়ে মানুষের যে ধারণা সেটি আমার ভেঙে গেছে। সবার ক্ষেত্রে কি হচ্ছে তা আমি জানি না। তাদের বিষয়গুলোই তারা দেখছে। ভাল পরিবেশ আর চরিত্রের দিক থেকে আমার দুটি চলচ্চিত্রে দুই ধরনের চরিত্র্। একজন নায়কের পাশে শুধু যে একজন নায়িকা থাকবে আমার ক্ষেত্রে বিষয়টি তেমন নয়। আমাকে অনেক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে চরিত্রের ক্ষেত্রে। সেদিক থেকে উচ্ছ্বাসটা একটু বেশিই।
প্রিয়.কম : আপনি ঢাকাই ছবির নবাগত নায়িকা। কিন্তু যে দুটি ছবিতে অভিনয় করছেন সেগুলো নায়কের নাম ভূমিকার, শুরুতেই আপনার ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব পড়বে কিনা?
শবনম বুবলি : আমার প্রথম সিনেমা ‘বসগিরি’র নামটা শুনে যেমন মনে হচ্ছে হিরো বেইজড, মুভিটা দেখলে বোঝা যাবে আসল কাহিনি কাকে নিয়ে। সম্পূর্ণ ছবিতে নায়িকার ভূমিকা দারুণ একটি বিষয়। শুটারের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। বলাটা খুব মুশকিল হিরো না কি হিরোইনভিত্তিক।
প্রিয়.কম : ভবিষ্যতে নিজেকে নায়িকা নাকি শিল্পী হিসেবে দেখতে চান?
শবনম বুবলি : অনেকে বলে আমি অভিনেত্রী হতে চাই। তবে একজন নায়িকাকে চলচ্চিত্রে যেভাবে গ্ল্যামারাসভাবে উপস্থাপন করা হয়, সেদিক থেকে আমি বলব আমি নায়িকা হতে চাই। আর এজন্য অভিনয় জানাটা সবার আগে দরকার। অভিনয় নাচ, অ্যাকশন ও এক্সপ্রেশন যেটাই থাকবে না কেন সেটিই জানতে হবে। আমি নায়িকা এবং অভিনেত্রী দুটোই হতে চাই।
প্রিয়.কম : আপনি তো নতুন অভিনয় করছেন। এক্ষেত্রে একই দৃশ্যে বা একই শট কী একাধিকবার দিতে হয়েছে?
শবনম বুবলি : আমি আসলে সবার আগে স্প্রিপ্টটা নিয়ে নিই। যার কারণে আগামীকাল আমার কোন কোন সিকোয়েন্স এ শুটিং হবে সেটি একদিন আগে রিহার্সেল করে নিই। এখন পর্যন্ত এক কিংবা দুই বারে শেষ করছি। সর্বোচ্চ তিন। আর পরিচালক আমাকে পুরোটা অভিনয় করে দেখিয়ে দিচ্ছেন। আর এত কো-অপারেশন যখন থাকে তখন এনজি শট হওয়ার সম্ভবনা খুব কম থাকে। সর্বোচ্চ তিন-চারবার শট নিতে হয়েছে।
প্রিয়.কম : সংবাদ পাঠিকা এরপর নায়িকা ভবিষ্যতে অন্য কোন পেশায় যাওয়ার ইচ্ছে আছে?
শবনম বুবলি : আমি আসলে আপাতত অভিনয়টা নিয়েই থাকতে চাই। আর ভাল কাজ করতে চাই। যদি কখনও মনে হয় না থাক আর অভিনয় করব না। তাহলে তখন অভিনয় ছেড়ে দিব। আমার পড়াশোনার যে ব্রাকগ্রাউন্ড তাতে যে কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেখার কিংবা পরিচালনা করার ইচ্ছে আমার রয়েছে। হয়তো সেটি বুটিকস, ফ্যাশনেবল হতে পারে। কিংবা যেটিতে আমি স্ব্যাচ্ছন্দ্যবোধ করব।
প্রিয়.কম : ঈদের কোন সিনেমাটি দেখতে প্রেক্ষাগৃহে গিয়েছিলেন?
শবনম বুবলি : সবাই ‘শিকারি’ নিয়ে এতো উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে তাই এই ছবিটি দেখতে ‘যমুনা ব্লকবাস্টার’রে গিয়েছিলাম। আর শুরুর দিক থেকেই তো আমার শুটিংয়ের কোনো বিরতি নেই। যার কারণে আর সময় করে উঠতে পারছি না। ছবিটি দেখার পর মনে হয়েছে শাকিবকে নিয়ে সকলের এত উচ্ছ্বাাসের কারণ টা কি? এক কথায় তো দারুণ। অনেক দিন পর দর্শক নতুন এক শাকিব কে দেখতে পেয়েছে দর্শক।
প্রিয়.কম : আমাদের পাশ্ববর্তী দেশের ফিল্মের যে অবস্থা তাতে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে আপনি নিজের ক্ষেত্রে কি ধরনের চ্যালেঞ্জ নিচ্ছেন?
শবনম বুবলি : এখন ২০১৬। এ সময়ে এসে আমরা এত বেশি সচেতন যেটি সত্তর, আশি কিংবা নব্বইয়ের দশকে ছিল না। তখন মোবাইল, ফেসবুক, ইউটিউব এত বেশি হাতের নাগালে ছিল না। আমরা অত কমপেয়ার করতে পারতাম না। হলিউড কিংবা বলিউডে কি হচ্ছে? এখন সবই আমরা জানতে পারছি। আর আমাদের দেশটা ছোট। টেকনিক্যালি এত উন্নত নয়। যার কারণে তাদের সাথে তুলনা করতে গেলে হবে না। আমরা শুধু ফিল্ম নয় অন্যান সকল বিষয়েও পিছিয়ে আছি। কিন্তু শুধু মিডিয়ার বিষয়গুলোই আমাদের চোখে পড়ে। আর আমাদের কাজগুলোতে যে একেবারেই মান থাকছে না তা নয়।
প্রিয়.কম : সিনেমার নায়িকার ‘তকমা’ আপনার কপালে লেগে গেছে, কিছুটা সময় পাড়ি দিয়েছেন এ মাধ্যমে, এখন পরিবারের লোকজন কি বলছেন?
শবনম বুবলি : আগে তো নির্দিষ্ট একটা সময় ছিল সরাসরি নিউজে যাচ্ছি। তাৎক্ষনিকভাবেই সকলেই দেখতে পাচ্ছেন। এখন আব্বু, আম্মু কিংবা আমার বোনদের সাথে যখন আলাপ করি, তারা জিজ্ঞেস করে কাজ ভাল হবে তো? দর্শক দেখবে তো, আনন্দ পাবে তো? মাঝখানে যে অস্তিরতা ছিল সেটি কাটবে তো। আমি তাদেরকে আশ্বস্ত করছি স্মার্ট কাজ হচ্ছে। তারা এখন নিশ্চিন্ত যে আসলেই ভাল কিছু একটা করার অপেক্ষা করছে।
প্রিয়.কম : আপনাকে সময় দেওয়ার জন্যে ধন্যবাদ।
শবনম বুবলি : আপনাকে এবং প্রিয়.কমকেও।