সিম জালিয়াতির দায় কার? উত্তর মিলছে বিবিসির প্রতিবেদনে

Simগাজী মিরান : বাংলাদেশে মোবাইল ফোনে ভুয়া সিম পাওয়া গেলে আগামী সপ্তাহ থেকে সংশ্লিষ্ট কোম্পানী বা অপারেটরের বিরুদ্ধে প্রতি সিমের জন্য ৫০ ডলার করে জরিমানা করার কথা বলছে বিটিআরসি। কারও অজান্তে আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে ভিন্ন সিম নিবন্ধনের অনেকই অভিযোগ করেছেন। এই পরিস্থিতিতে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিটিআরসিও উদ্বেগজনক বলে মনে করেন।
এর দায় কার? কেনো এমন জালিয়াতির ঘটান ঘটছে? এমন প্রশ্নের জবাবা মিলেছে বিবিসি বাংলার একটি প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে জানাযায়, বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে মোবাইল সিমের নিবন্ধন জালিয়াতির অভিযোগে পুলিশ সম্প্রতি যেসব এলাকায় অভিযান চালিয়েছে এমন একটি এলাকা ঢাকার আদাবর। কিন্তু আদাবরে এই বিষয়ে কোনো দোকান মালিকই কথা বলতে চাচ্ছেন না।
তবে আদাবরের সিম জালিয়াতির শিকার এক কম্পিউটার ব্যবসায়ী শুভ আহম্মেদ বলেন, আমার সিম অন্যত্র নিবন্ধন হওয়ার ঘটনা থানা পুলিশ এবং মোবাই আপারেটরের কাছে জানালেও এর কোনো প্রতিকার আমি পাইনি। তিনি বলেন, আমার সিম নিবন্ধনের সাথে সাথে আরও ৫টি সিম নিবন্ধ হয়ে গেছে আমার নামে। এখন এই সিম দিয়ে যদি কোনো ধরনের সমস্যা হয় তাহলে এর দায়ভার কি নেবে সরকার? নাকি লাস্ট পর্যন্ত আমাকেই নিতে হবে? এর সঠিক সমাধান চাই আমি।
আদাবরে শুভ আহম্মদের মত ঢাকার এবং দেশের অন্যান্য জায়গা থেকেও অনেকেই এ ধরনের জালিয়াতির শিকার হওয়ার পর অভিযোগ তুলেছেন। এ নিয়ে গ্রাহকদের মনে উদ্বেগ রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিটিআরসির চেয়ারম্যান শাহজাহান মাহমুদ বলেন, এমন জালিয়াতির ঘটনা বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের উদ্দেশ্যকে আঘাত করেছে। যে কারণে এটি উদ্বেগের বলে আমি মনে করি।
তিনি আরও বলেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী একজনের কাছ থেকে অনেকগুলো অঙ্গুলের ছাপ নিয়ে এই অপকর্মগুলো করছে।
গত ১৬ ডিসেম্বর থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৩ মাস ধরে সারা দেশে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম নিবন্ধন প্রক্রিয়া চলেছে। মাস খানে আগে বন্দর নগর চট্টগ্রাম ও রাজধানী ঢাকার তেজগাঁও এলাকায় পুলিশি অভিযানে সাড়ে ৪ হাজারে মত সিম উদ্ধার করা হয়। এ সব সিমের নিবন্ধন বা কাগজপত্র যাদের নামে রয়েছে তারা এ ব্যাপারে কিছুই জানতেন না।
পুলিশের তেজগাঁও অঞ্চলের উপকমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার বলছেন, প্রায় ১ মাস আগে একটি ছিনতাইয়ের ঘটনা তদন্তে করতে গিয়ে এই সিম জালিয়াতির ঘটান বেরিয়ে আসে। তখন আমরা জানতে পারি ছিনতাইকারীরা ১টি নাম্বার ব্যবহার করছে। কিন্তু পরবর্তিতে যখন এই নাম্বারটির মালিকের সন্ধানে যাওয়া হয় তখন দেখা যায় যে এই সিমের মালিক ১ মহিলা। কিন্তু ঐ মহিলা ছিন্তাইয়ের কাজে কোনোভাবে জড়িত নয়। তিনি জানেন না তার নামে আরও সিম নিবন্ধন হয়েছে। তখনি এই বিষয়টা আমাদের নজরে আসে। এবং তারই প্রেক্ষাপটে আমারা ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু সিম সংরক্ষণ করেছি। এবং এর পেছনে কারা আছে তাদের চিহ্নিত করার চেষ্টাও করছি। এবং ইতমধ্যে তেজগাঁয়ে সিম জালিয়াতির অভিযোগে একটি মোবাইল কোম্পানীর মাঠ পর্যায়ের ৩ জন কর্মকতাও গ্রেফতা হেয়েছে।
যদিও বিটিআরসি মনে করেন, এর দায় সংশ্লিষ্ট সকলের। একই সাথে সংস্থাটি বলছে, মাঠ পর্যায়ে সিম বিক্রেতাদের অনেকেই গ্রাহকের আঙ্গুলের ছাপ নিয়েই এসব অপরাধ করেছে।
আমাদের দেশে যে সকল বেসরকারী মোবাইল অপারেটর রয়েছে, তার কেউই সিম জালিয়াতির প্রশ্নে কথা বলতে চায়নি। তারা এর দায় মাঠ পর্যায়ের কর্মীদে ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন এবং বলেছেন, তারা বিভিন্ন মানুষকে ভূল বুঝিয়ে এক বারের জায়গায় প্রায় ৩ থেকে ৪ বার অঙ্গুলের ছাপ নিয়ে এই অপকর্মগুলো করছে।
কিন্তু মাঠপর্যায়ের কর্মীরা এবং দোকানদাররা বলছেন, একজনের সিম আরেজনের নামে নিবন্ধন করা যায় না। আর এটা যদি হয়ে থাকে তাহলে তারা জানে আমার কিছু জানি না। তারা বলেন, কোম্পানী আমাদের যেভাবে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন আমরা সেই ভাবেই কাজ করছি।
কোন পদ্ধতিতে জালিয়াতির ঘটানাগুলো ঘটেছে সে ব্যাপরে সব পক্ষরই এক মত। কিন্তু সমস্যা কোথায় ছিল সেই প্রশ্নে কেই দায় নিতে রাজি নয়। টেলিযোগাযোগ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ আবুসায়িদ খান মনে করেন, সিম বিক্রির ব্যবস্থায় যেমন সমস্যা রয়েছে একইসাথে জাতীয় পরিচয়পত্রের ডাটা বেইজেও সমস্যা রয়েছে। আর এসব কারণেই এমন অপরাধ করা সুযোগ তৈরি হয়েছে।
গ্রাহকের হাতে থাকা মোবাইল সিমের সংখ্যা ছিল ১৩ কোটি ২০ লাখ। যার মধ্যে বায়োমেট্রিক নিবন্ধন হয়েছে ১১ কোটি ৭ লাখ। এর মধ্যে জালিয়াতির অভিযোগ কত এসেছে সে ব্যাপারে বিটিআরসি বা কোম্পানীগুলো এবং পুলিশ কেউই সঠিক কোনো সংখ্যা দিতে পারছে না।
তবে এমটবের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ৫ হাজারের মত সিম জালিয়াতি হয়েছে বলে তাদের ধারণা। এমটবের কর্মকর্তা রুহুল কবির বলেন, আমরা অনিবন্ধিত সিমগুলো চিহ্নত করতে পেরেছিন যেটা আমাদের সাফলতা।
পুলিশি অভিযানে যেগুলো ধরা পড়েছে তার তদন্তই বা কতটুকু এগিয়েছে সেটাও কেউ বলছে না। এই সিম জালিয়াতির ইস্যুতে টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমের সাথে কথা বলতে চাইলে সেও কোনো কথা বলতে চাইছেন না।
তবে বিটিআরসির শাহজাহাস মাহমুদের কথা হচ্ছে, জরিমানাসহ কঠর কিছু ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, নাগরিকদের এই অবন্থাথেকে বাঁচানোর জন্য পুলিশের আরও কঠর হতে হবে।

সূত্র : বিবিসি বাংলা