পালিয়ে বেড়াচ্ছেন শতাধিক রাজাকার

Tribunal_ডেস্ক রিপোর্ট: গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে দেশে-বিদেশে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন শতাধিক রাজাকার। এদের মধ্যে ১০ জনের যুদ্ধাপরাধের মামলায় সাজা হয়েছে এবং ৩৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা চলছে। অভিযোগ তদন্তাধীন আছে, এমন সন্দেহভাজন যুদ্ধাপরাধীর মধ্যে পালিয়ে আছেন ৩৮ জন। সব মিলিয়ে পলাতক ৮৪ জন। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলার তৃণমূল রাজাকার সংগঠকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তারা আত্মগোপনে চলে যাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিচার চলাকালে আসামিরা পালিয়ে থাকলে বিচারপ্রার্থীর কাছে মনে হয় না যে তারা বিচার পাচ্ছেন। তবে আসামির অনুপস্থিতিতে বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে আইনগত কোনো বাধা নেই।
এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত কর্মকর্তা সানাউল হক বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করার আগেই অধিকাংশ আসামি আত্মগোপনে চলে যাচ্ছেন। তদন্ত সংস্থাকে যদি গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হতো তাহলে আসামিরা পালানোর সুযোগ পেত না।
তিনি আরো বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামিদের মধ্যে বিচারকে এভয়েড করার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, সেটা বন্ধ করতে তদন্ত সংস্থাকে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া উচিত।
গত ছয় বছরে দুটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ২৩ মামলার রায়ে ৩১ যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসিসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। এর মধ্যে সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামির সংখ্যা ১০। তদন্ত সংস্থা জানিয়েছে, পলাতকদের গ্রেপ্তারের জন্য তৎপরতা অব্যাহত আছে। আসামিদের মধ্যে যারা বিদেশে পালিয়ে আছেন, তাদের ফিরিয়ে আনার জন্য পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ তৎপরতা চলছে। এ ছাড়া ট্রাইব্যুনালে বেশ কয়েকজন পলাতক আসামির অনুপস্থিতিতেই বিচার কাজ শুরু হয়েছে। এ পর্যন্ত ছয় যুদ্ধাপরাধীর চূড়ান্ত দ- কার্যকর হয়েছে। ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে ছয়টি মামলার বিচার চলছে। এ ছাড়া ২৬টি মামলায় ৭৫ জনের বিষয়ে তদন্ত চলছে। তাদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, গণহত্যা, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ধর্মান্তকরণসহ মানবতাবিরোধী বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ রয়েছে।
২০১০ সালে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় এ পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ শতাধিক অভিযোগ জমা হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে, তাদের বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। অনেকে পলাতক আছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে অনেক আসামি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে দেশত্যাগ করেন। সম্প্রতি পলাতকদের বিচার চলাকালে ট্রাইব্যুনাল একাধিকবার তদন্ত সংস্থার ওপর অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা জানায়, ২০১০ সালে ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর এ পর্যন্ত যেসব যুদ্ধাপরাধীর বিচার হয়েছে, তাদের মধ্যে পলাতক আছেন আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার, আলবদর নেতা গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুরের আশরাফুজ্জামান খান, ফেনীর চৌধুরী মাঈনুদ্দীন, নগরকান্দার প্রাক্তন পৌর চেয়ারম্যান জাহিদ হোসেন খোকন ওরফে খোকন রাজাকার, পিরোজপুরের আবদুল জব্বার ইঞ্জিনিয়ার, নেত্রকোনার সৈয়দ মো. হাসান আলী, কিশোরগঞ্জের চার রাজাকার ক্যাপ্টেন (অব.) নাসিরউদ্দিন আহমেদ, গাজী আবদুল মান্নান, হাফিজ উদ্দিন ও আজহারুল ইসলাম। এর মধ্যে আবদুল জব্বারকে আমৃত্যু কারাদণ্ড ও অন্য নয়জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে যেসব যুদ্ধাপরাধীর বিচার চলছে, তাদের মধ্যে পলাতক ৩৬ জন হলেন- জামালপুরের আশরাফ হোসেন, অধ্যাপক শরীফ হোসেন, আবদুল মান্নান, আবদুল বারী, হারুন ও আবুল হাশেম; হবিগঞ্জের মুজিবুর রহমান ওরফে আঙ্গুর মিয়া, কিশোরগঞ্জের নাসির উদ্দিন, গাজী আবদুল মান্নান, হাফিজ উদ্দিন ও আযহারুল ইসলাম, যশোরের ইব্রাহিম হোসেন, শেখ মোহাম্মদ মুজিবুর, আজিজ সরদার, কাজী ওহিদুল ইসলাম, আবদুল খালেক মোড়ল ও মশিয়ার রহমান, সাভারের আবুল কালাম, লক্ষ্মীপুরের ইউসুফ, ঢাকার আবদুল কুদ্দুস, সৈয়দ মোহাম্মদ হুসাইন ও জয়নাল আবেদীন এবং কক্সবাজারের মৌলভি জাকারিয়া সিকদার, অলি আহমদ, জালাল উদ্দিন, সাইফুল ওরফে সাবুল, মমতাজ আহম্মদ, হাবিবুর রহমান, আমজাদ আলী, আবদুল মজিদ, আবদুস শুক্কুর, জাকারিয়া, মৌলভি জালাল, আবদুল আজিজ ও ইদ্রিস আলী সরদার।
পলাতক সন্দেহভাজন ৩৮ জন : ট্রাইব্যুনালে জমা পড়া অভিযোগগুলোর মধ্যে অনেকগুলোর তদন্ত চলছে। অভিযোগ তদন্তনাধীন রয়েছে এমন ৩৮ জন পালিয়ে আছেন। তাদের মধ্যে আছেন- নেত্রকোনার খালেক তালুকদার, কবির খান, নূর উদ্দিন, সালাম বেগ ও শেখ মো. এ মজিদ, মৌলভীবাজারের শামছুল হক, নেছার আলী, মোবারক মিয়া, ফখরুজ্জামান, আবদুস সাত্তার, খন্দকার গোলাম রব্বানী, আবদুন নূর তালুকদার, আনিস মিয়া ও আবদুল মুছাব্বির মিয়া, ময়মনসিংহের ওয়াজউদ্দিন, গাইবান্ধার প্রাক্তন সংসদ সদস্য জামায়াত নেতা আবু সালেহ মো. আজিজ মিয়া ওরফে ঘোড়ামারা আজিজ, নাজমুল হুদা, রুহুল আমিন মঞ্জু, আবদুল লতিফ ও আবু মুছলিম মোহাম্মদ আলী, দিনাজপুরের আবদুর রহিম মিয়া, জামালপুরের বেলায়েত হোসেন, নাসির উদ্দিন ও ইসমাইল হোসেন, ময়মনসিংহের কাজী বদরুজ্জামান, গাইবান্ধা সদরের আবদুল জব্বার ম-ল, জাসিজার রহমান ওরফে খোকা, আবদুল ওয়াহেদ ম-ল, মমতাজ আলী বেপারী, আজগর হোসেন খান ও মো. রঞ্জু মিয়া, হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার মো. লিয়াকত আলী, কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের আমিনুল ইসলাম ওরফে রজব আলী, আটপাড়ার খলিলুর রহমান এবং প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী বিএনপি নেতা কিশোরগঞ্জের ড. ওসমান ফারুক।
যুদ্ধাপরাধ মামলায় পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত সংস্থার জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক সানাউল হক জানান, পলাতকদের গ্রেপ্তারে আমাদের তৎপরতা অব্যাহত আছে। পুলিশ নিয়মিত মনিটরিং করছে। ইন্টারপোলের মাধ্যমে পলাতকদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।সূত্র: রাইজিংবিডি