সংস্কার ছাড়া পুঁজি বাজারে আস্থা ফিরবে না : ড. খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ(অডিও)

ibrahim-khaleda-400x228রাহমান আরিফ : পুঁজিবাজারের চলমান সঙ্কট ও উত্তরণের পথ, ইদানিংকালের বিভিন্ন মহল থেকে পুঁজিবাজারবান্ধব বাজেটের সুপারিশ, তদন্ত কমিটির সুপারিশ মনে পুঁজিবাজারে আমূল সংস্কার এবং বাজারের উন্নয়নে সরকারের সক্ষমতা ইস্যুতে খোলামেলা কথা বলেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ড. খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ।
পুঁজিবাজার বান্ধব বাজেটের কথা বলা হচ্ছে, আপনার অভিমত?
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : বাজেটের সঙ্গে পুঁজিবাজারের সম্পর্ক নেই। বাজেট দিয়ে পুঁজিবাজারকে চাঙ্গা করার কোনো পদ্ধতি আছে বলে আমার জানা নেই। যারা ট্যাক্স কমানোসহ আরো কিছু সুবিধা দাবি করে সেটা তাদের স্বার্থপরতা। আমার জানামতে বাজেট দিয়ে পুঁজিবাজারের কিছু করা যায় না। পুঁজিবাজার সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের একটি বাজার, মার্কেট বলতে যা বোঝায় এটা তা না।
তাহলে মূল বিষয় কী?
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : এখানে সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে আস্থা। বাজেট দিয়ে আস্থা সৃষ্টি করা যায় না। সবার আগে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করতে হবে।
আস্থা ফেরাতে করণীয়?
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে পুঁজিবাজারে আমূল সংস্কার আনা প্রয়োজন। আমরা তদন্ত প্রতিবেদনে ডি-মিউচ্যুয়ালাইজেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উভয় স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা থেকে মালিকানা পৃথক করার সুপারিশ করেছি। অর্থাৎ, যারা মার্কেট প্লেয়ার তাদের স্টক একচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা থেকে সরাতে হবে। ডি-মিউচ্যুয়াইজেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, কিন্তু সত্যিকার অর্থে কোনো পরিবর্তন আসেনি। ডি-মিউচ্যুয়ালাইজেশনের পর ‘শেয়ারধারী পরিচালক’ পদের আড়ালে মার্কেট প্লেয়াররা এখনো ব্যবস্থাপনার সঙ্গে আছেন। তারাই স্টক এক্সচেঞ্জের কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণ করছেন বলেও জানতে পারছি। ডি-মিউচ্যুয়ালাইজেশন ছদ্মনামের আড়ালে আগের কাজ কারবারই চলছে। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কর্মকান্ডের ওপর হস্তক্ষেপের অভিযোগে এক জিএমকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অনেক উল্টাপাল্টা কাজ-কর্মের অভিযোগ রয়েছে।
মার্কেট প্লেয়ারদের হস্তক্ষেপ থেকে বের হবার উপায় কী?
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : মার্কেট প্লেয়ারদের থেকে বাজারকে মুক্ত করতে আমূল সংস্কার দরকার। প্রতিবেশি দেশগুলোর আদলে স্টক এক্সচেঞ্জগুলোকে ডি-মিউচ্যুয়ালাইজড করা হলেও কিছুটা উন্নতি হবে। দেখুন, উভয় স্টক এক্সচেঞ্জেই নতুন স্টক ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রায় বন্ধ রয়েছে। উভয় পুঁজিবাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি করতে হলে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ দিতে হবে। নতুন ব্লাড ছাড়া অসুস্থ প্রতিযোগিতা-অনিয়ম বন্ধ হবে না। বরং পুরনো যে কতগুলো জীবানু পুঁজিবাজারে আছে সেগুলোকে মার্কেটকে ধ্বংস করে দেবে, এরইমধ্যে ধ্বংস করে দিয়েছে। এই জীবানুরা বাজারকে উদ্ধার করতে পারবে না। সেজন্য যতশীঘ্র সম্ভব মেম্বারশিপ ওপেন করে দেয়া প্রয়োজন, তাতে অবস্থার উন্নতি হতে পারে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির ভ’মিকা নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে, আপনি কীভাবে দেখছেন?
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিএসইসির কাছে আমরা যে দক্ষতা, সততা এবং কঠোরতা আশা করেছিলাম বাস্তবে তার বিন্দুমাত্র নাই। সেজন্য বিএসইসির ওপরেও আস্থা নাই। সেজন্য সংস্থাটির সংস্কারের বিষয়েও বলা হচ্ছে। বিশেষ করে, প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান একজন অধ্যাপক মানুষ, কিন্তু তারমধ্যে কোনো কঠোরতা নাই। এমনকি বাইরে থেকে শোনা যায় যে, তার সঙ্গে মার্কেট প্লেয়ার বা দুষ্টুদের সম্পর্ক-সহযোগিতাও নাকি আছে। এগুলো বাইরের শোনা কথা, আমি সত্য-মিথ্যা ঠিক জানি না, এ বিষয়গুলো দেখা দরকার।
সংস্থাটিকে শক্তিশালী করতে তুলতে হলে বাস্তবসম্মত এবং কঠোর একজন প্রশাসক ওখানে বসাতে হবে। এর আগেও যোগ্য লোক সেখানে ছিলেন। এখন এই অধ্যাপক দিয়ে কিছু হবে বলে আমার মনে হয় না।
তদন্ত কমিটির সুপারিশ কতটুকু আমলে নেয়া হয়েছে?
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : পুঁজিবাজারে স্মরণকালের ভয়াবহ ধসের কারণ তদন্তে গড়া কমিটির পক্ষ থেকে বেশকিছু সুপারিশ করা হয়েছিলো। কিন্তু সেগুলোর অধিকাংশই আমলে নেয়া হয়নি। যেমন: ডি-মিউচ্যুয়ালাইজেশন আমাদের সুপারিশ ছিলো। তারা যেটা করেছে সেটা ডি-মিউচ্যুয়ালাইজেশন হয়নি। অন্যদেশের সঙ্গে তুলনা করলে বলা যায় যে, ডি-মিউচ্যুয়ালাইজেশনের নামে ‘স্যাবোটাজ’ করা হয়েছে। সেজন্যই আমি মনে করি, আমাদের সাজেশনগুলো গ্রহণ করা হয়নি। আমরা সুনির্দ্দিস্ট তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরে কিছু ঘটনা অধিকতর তদন্তের কথা বলেছিলাম, যারমধ্যে বেশকিছু ক্ষেত্রে অপরাধীদের চিহ্নিত করা সম্ভব ছিলো। কিন্তু একটি ঘটনারও তদন্ত সুষ্ঠুভাবে হয়নি। প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরার পরও অপরাধের সত্যতা পাওয়া না-পাওয়া দায়িত্বশীলদের আন্তরিকতা ও দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। তারা চাইলে অনেক কিছুই করতে পারতেন, কিন্তু তাদের সেই আন্তরিকতা নেই।

আপনি আমূল সংস্কারের কথা বলছেন, এ বিষয়ে সরকার কতোটা আন্তরিক বলে মনে করেন?
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : আমরা সবাই জানি যে, আমূল সংস্কার দরকার। কিন্তু সরকার আমূল সংস্কার আনতে সক্ষম বলে আমার মনে হচ্ছে না। কারণ এই কাজটা অর্থ মন্ত্রণালয় করবে তো, অর্থমন্ত্রী যে রকম দোদুল্যমান মানুষ তাতে তিনি এটা করতে সক্ষম- বলে আমার মনে হয় না। সেজন্য সরকার কিছু করবে, এমনটা আমি আশাও করছি না।