এটা রাষ্ট্র ধর্মের মামলা না, রাষ্ট্রের মামলা ছিল : সলিমুল্লাহ খান

salimullah-khan20150905235311-400x248 (1)গাজী মিরান : ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস-এর অধ্যাপক ড. সলিমুল্লাহ খান বলেছেন, ‘রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মকে মেশালে সেটা সরকার ও রাষ্ট্রকেও ধ্বংস করে। আসলে এখানে প্রশ্নটা ভুলভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে, এখানে মনে করা হচ্ছে এটা রাষ্ট্রধর্মের মামলা, আসলে এটা রাষ্ট্র ধর্মের মামলা না, এটা রাষ্ট্রের মামলা। রাষ্ট্র এবং ধর্ম কথাটি একসাথে আনা হয়েছে সোনায় পাথর বাটির মত।
সোমবার ইন্ডেপেন্ডেন্ট টেলিভিশনে ‘আজকের বাংলাদেশ’ নামের একটি অনুষ্ঠানে সমাজতাত্ত্বিক ও অধ্যাপক ড.সলিমুল্লাহ খান এ কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘এখন যদি বলি বাংলাদেশের রাষ্ট্র ধর্ম হবে ইসলাম, তবে সব ধর্মের মানুষের ধর্ম পালনের সুবিধা থাকবে। এটা সংবিধানের ২ এর খ ধরাতে আছে।’
বর্তমান সংবিধানে আরও উল্লেখ আছে, রাষ্ট্র কোনো নাগরিকের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করতে পারবে না। এই লেখা দুটি বর্তমানের সংবিধানে একসাথেই আছে। তাই এটা সংগতিপূর্ণ কি না, সেটাই বিবেচনার বিষয়- বলেন তিনি।
তিনি বলেন, আমি আমেরিকান একটা মামলার উদাহরণ দেই, ১৯৬২ সালে একটা বিখ্যাত মামলা হয়েছিল সেখানে বিচারক চার্লস একটা মন্তব্য করেছিলেন, ‘রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মকে মেশালে সেটা সরকার ও রাষ্ট্রকেও ধ্বংস করে। এমন কি ধর্মের অবমাননা করে।’
তিনি বলেন, ২০০০ সালে পৃথিবীর ১৮৮টি দেশের ধর্ম নিয়ে গবেষণা করে এক গবেষক। সেই জরিপে গবেষক দেখিয়েছেন, তখন শতকরা ৪০টি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রধর্ম ছিল। পৃধিবীতে একসময় অনেক বেশি রাষ্ট্রের রাষ্ট্র ধর্ম রাখা হতো। যেটা এখন কমে আসছে, কিন্তু ১৯৭০-২০০০ সন থেকে রাষ্ট্র ধর্ম বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ড.সলিমুল্লাহ খান বলেন, “আসলে রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম করলে কোনো উপকার হবে কি না এটা ভাবার বিষয়”।
তিনি আরও বলেন, আমি একটা গবেষণার কথা বলতে চাই, যে সমস্ত রাষ্ট্রে একটা বিশেষ রাষ্ট্র ধর্ম গ্রহণ করা হয়েছে, সেই সমস্ত দেশে ধর্ম পালনের হার অনেক কমে গেছে। অর্থাৎ ধর্মেরও কোন উপকার হয় না। এখানে মূল বিষয়টা রাষ্ট্র ধর্ম নয়, এখানে রাষ্ট্র ধর্ম বনাম অরাষ্ট্র ধর্মও নয়। এখানে বিষয়টা ধর্মীয় স্বাধীনতা নাকি রাষ্ট্র ধর্ম ?
ড.সলিমুল্লাহ খান বলেন, এই বিষয়ে আইন বদলাচ্ছে, বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয়েছে সেই সময়ের উচ্চ আদালতের রায়গুলো যে ভাবে ছিল তা হলো, যে ব্যক্তি সংক্ষুব্ধ হতে চায় তার যে নিজের স্বার্থ ক্ষুন্ন হয়েছে এমন প্রমাণ দিতে হবে। এরকম একটি মামলা হয়েছে ১৯৭৪ সালে বেরুবাড়ি মামলা নামে। তাই এটাকে সংক্ষুব্ধ হিসেবে আনা যায়। ৯০এর দশকে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ এমন কিছুর রায় দিয়েছেন। বিশেষ করে ড.মহিউদ্দিন ফারুক যে সমস্ত জনস্বার্থের মামলা করেছিলেন সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তিনি বলেন, এখন আর ব্যক্তিগত ভাবে ক্ষতি দেখাতে হবে না। এখানে দেশের নাগরিক স্বার্থ ক্ষুন্ন হচ্ছে এই করনে, যে কোন নাগরিক নিজেকে সংক্ষুব্ধ হিসেবে মামলা করতে পারবেন। এছাড়াও জনস্বার্থের মামলার আরও একটি নতুন দিক উন্মচন হয়েছে ভারত সহ অন্যান্ন দেশে।
তিনি বলেন, সেখানে বলা হয়েছে যদি জনস্বার্থে কোনো ব্যক্তি মামলা করেন সেই ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্বার্থ প্রমাণ করার দরকার নেই। জনগণের স্বার্থের ক্ষতি হচ্ছে এটাই যথেষ্ট। তাছাড়াও সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ এবং সুপ্রিমকোর্ট নিজেই কোনো কোনো বিষয়, বা পত্রিকায় প্রকাশিত চিঠি বা কোনো একটা বেসরকারি চিঠিকে কেন্দ্র করেও তারা নিজেরাই নিজেদের অধিকার গ্রহণ করতে পারে।
তিনি বলেন, আমাদের দেশে যেটা হয়েছে সেটা হলো, কোনো সংগঠন যদি সংগঠন হিসেবে মামলা করে এবং সেই সংগঠন যদি নিয়ম অনুযায়ি রেজিষ্ট্রি না হয় তাহলে সেটা কৌশলগতভাবে তাদের যোগ্যতা নেই বলা যেতে পারে। এখানে সংগঠন আর ব্যক্তি কিন্তু আলাদা ব্যাপার। সংবিধানের কোনো মৌলিক ধারার সাধারণ গঠন ক্ষুন্ন হয়েছে জানলে প্রত্যেকে এখানে নিজেকে সংক্ষুব্ধ করতে পারবেন।
ড.সলিমুল্লাহ খান বলেন, ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশে একটা বিখ্যাত মামলা হয়েছে যেটাতে অষ্টম সংশোধনী মামলা বলা হয়। মামলাটার নাম ছিল আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বনাম বাংলাদেশ মামলা। ঐ মামলার বিষয় ছিল, অষ্টম সংশোধনীর হাইকোর্ট ডিবিশনের ৬টি স্থায়ী বেঞ্চ ঢাকার বাইরে করা হয়েছিল। তাতে সংক্ষুব্ধ হয়ে মামলা করা হয়েছিল এবং আপিল বিভাগ রায়টিতে বলেছিল “সংবিধানের যে সংশোধনীর বলে করা হয়েছিল তার সংবিধানের ১০০ ধারা সংশোধন করা হয়েছিল যা বাতিল বলে ঘোষণা করেছি”। অর্থৎ সংসদও ইচ্ছা করলে এমন কোনে আইন করতে পারেন না যেটা সংবিধানের মূল কাঠামোর বিরোধী।
তিনি বলেন, অষ্টম সংশোধনীর যে অংশ রাষ্ট্র ধর্ম মামলা হিসেবে এখন বিখ্যাত হয়েছে। এই দুটো কিন্তু একই সংশোধনী। “সেটাও ত্বাত্তিক ভাবে কিন্তু বাতিল হয়ে যায়”। আমি ত্বাত্তিক এই কারনে বলছি, আপিল বিভাগের যে কারনে সংশোধনী বাতিল হয়েছে। ঐ সময় শাহাবুদ্দীন হাবিবুর রহমান সাহেবসহ ৪ জন ছিলেন, তাঁরা একমথ হয়ে ছিলেন এবং বলেছিলেন ১৯৭৩ সালে ভারতের একটা মামলা হয়েছিল সেই মামলার আদলে তারা এই রায়টা দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন আমাদের দেশেও এটা প্রযোজ্য। তার মানে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সাধারণ গঠনকে ক্ষুন্ন করে এমন কোন সংশোধনী আনার ক্ষমতা সংসদেরও নেই। যার জন্য অষ্টম সংশোধনীর মামলা সেই অংশ বাতি হয়েযায়।
তিনি বলেন, ‘তখন নৌতিকভাবে প্রশ্ন উঠে যে অপর অংশ সংবিধানের কাঠামো ক্ষুন্ন করেছে কি করে নাই?’ এটাই তো বিবেচনার বিষয়। অর্থাৎ হাইকোর্ট ডিভিশনে স্থায়ী বেঞ্চ ছাড়া অন্যকেও করতে পারবে না। এখানে শুধু স্থায়ী বেঞ্চ হলেই মৌলিক কাঠামো ক্ষুন্ন হয়। কারণ আমাদের রাষ্ট্র হচ্ছে একক কেন্দ্রীয় স্বাধীন রাষ্ট্র।