আসামের রক্তাক্ত বাংলা ভাষা দিবস ও শিলচর স্টেশনের কথা

3372-400x160মোহাম্মদ আলী বোখারী, টরন্টো থেকে : ষাটের দশকে আসামের বরাক উপত্যকা তথা শিলচরে বাংলা ভাষা রক্ষায় একটি রক্তক্ষয়ী আন্দোলন হয়। তাতে একদিনের ঘটনায় এগারোজনের প্রাণ যায়। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সেই ঘটনার কথা আমরা অনেকেই হয়তো জানি না। কিন্তু অনলাইন উইকিপিডিয়ায় ‘বেঙ্গলি ল্যাংগুয়েজ মুভমেন্ট অব বরাক ভ্যালি’ নামে তার ইতিবৃত্ত বিদ্যমান।
জানা যায়, ১৯৪৭ থেকেই সংসদের সূচনায় ভাষার বিষয়টি আসাম রাজ্যে প্রকটতর হতে থাকে। অবশেষে ১৯৬০ সালের ৩ মার্চ তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী শ্রী বিমলা প্রসাদ চালিহা ‘অসমীয়’ ভাষাকে একমাত্র রাজ্যের ভাষা হিসেবে সংসদে ঘোষণা দেন। এতে উত্তেজনা ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে পড়লে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বসবাসরত বাংলাভাষী হিন্দুদের উপর অসমীয়রা চড়াও হয়। ওই বছর জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে সহিংসতা তীব্র আকার ধারণ করলে প্রায় ৫০ হাজার বাংলাভাষী হিন্দু ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নেয়। পাশাপাশি বরাক উপত্যকার প্রায় ৯০ হাজার মানুষ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নানা জায়গায় নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে পালিয়ে যায়। বিষয়টি তদন্তে বিচারপতি গোপাল মেহরোত্রার নেতৃত্বে গঠিত একক কমিশন এক রিপোর্টে জানায় যে, সহিংসতার ফলে কামরূপ জেলার গড়েশ্বরের ২৫টি গ্রামে হিন্দুদের ৪ হাজার ১৯টি কুঠির ও ৫৮টি বসতবাড়ী পুরোপুরি তছনছ ও ধ্বংস করা ছাড়াও নয়জন হিন্দু নিহত ও শতাধিক আহত হয়।
বিশদ ইতিবৃত্তে প্রকাশ, ফের ১৯৬০ সালের ১০ অক্টোবর মুখ্যমন্ত্রী শ্রী বিমলা প্রসাদ চালিহা ‘অসমীয়’ ভাষাকে রাজ্যের একমাত্র ভাষা হিসেবে স্বীকৃতির জন্য একটি বিল উত্থাপন করেন। তাতে দুই-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠীর ওপর এক-তৃতীয়াংশের ভাষাকে প্রতিষ্ঠায় করিমগঞ্জ উত্তর আসনের বিধায়ক রণেন্দ্র মোহন দাস সেটির বিরোধিতা করেন। অথচ দুই সপ্তাহ পর, ২৪ অক্টোবর তা পাস হয়। ফলশ্র“তিতে পরের বছর, ১৯৬১ সালের ৫ ফেব্র“য়ারি বরাক উপত্যকার বাংলা ভাষা সংরক্ষণে কাছাড় গণসংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ১৪ এপ্রিল শিলচর, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দির মানুষ আসাম সরকারের বিরুদ্ধে ‘সংকল্প দিবস’ পালন করে। ২৪ এপ্রিল তারা গণসচেতনতা সৃষ্টিতে শিলচর ও করিমগঞ্জে দু-সপ্তাহকালের ২০০ মাইলের পদযাত্রায় অবতীর্ণ হয়, যা ২ মে শিলচরে শেষ হয়। অনুরূপ পদযাত্রা হাইলাকান্দিতেও সংঘটিত হয়। এতে গণসংগ্রাম পরিষদের প্রধান রথীন্দ্রনাথ সেন বাংলাসহ অপরাপর ভাষাকে রাজ্যের ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য ১৯৬১ সালের ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেন, নতুবা ১৯ মে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল হবে বলে ঘোষণা দেন। ১২ মে শিলচরে আসাম রাইফেল, মাদ্রাজ রেজিমেন্ট ও সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ তাদের যৌথ কুঁচকাওয়াজ সম্পন্ন করে। ১৮ মে আসাম পুলিশ ওই আন্দোলনের প্রধান রথীন্দ্রনাথ সেন, নেতৃস্থানীয় নলিনীকান্ত দাস ও যুগশক্তির সম্পাদক বিধুভূষণ চৌধুরীকে গ্রেফতার করে। যথারীতি ১৯ মে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল শুরু হয়। সকাল থেকেই শিলচর, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দির সরকারি অফিস, কোর্ট ও রেলওয়ে স্টেশনে আন্দোলনকারীদের বিক্ষোভ সংঘটিত হয়। তাতে শিলচর স্টেশনে সকাল পৌণে ৬টার ট্রেনের একটি টিকেটও বিক্রি হয়নি। সেখানে শেষ ট্রেনটি ছিল বিকেল ৪টায়, তারপরই কার্যত হরতাল শেষ হওয়ার কথা। অথচ দুপুর নাগাদ আসাম রাইফেলের জোয়ানরা সেখানে চলে আসে। বেলা আড়াইটার দিকে পুলিশ কোটিগোড়া থেকে পাকড়াও ৯ জন আন্দোলনকারীকে নিয়ে একটি বেডফোর্ড ট্রাকে করে যাবার সময় তাঁরাপুর স্টেশনের বিক্ষোভকারীদের আক্রমণের মুখে পড়ে। তাতে ভয়ে চালক ও পুলিশ আসামীদের ছেড়ে পালিয়ে গেলে কেউ একজন ট্রাকটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যে দমকলবাহিনী এসে তা নিভিয়ে ফেলে। তারপর স্টেশন এলাকায় প্যারামিলিটারি এসে বিক্ষোভকারীদের এলোপাতাড়ি পেটাতে থাকে এবং ৭ মিনিট সময়ের মধ্যে তারা ১৭ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। তাতে ১২ জন বিক্ষোভকারীকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে সেদিনই ৯ জনের মৃত্যু ঘটে, দুজন পরবর্তীতে মারা যান এবং অবশিষ্টজন, কৃষ্ণ কান্ত বিশ্বাস বুকে গুলি ধারণ করে ২৪ বছর অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ১৭ আগস্ট পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। ওই আÍাহুতির অপরাপরা হচ্ছেন- কানাইলাল নিয়োগী, চণ্ডিচরণ সূত্রধর, হƒতেশ বিশ্বাস, সত্যেন্দ্র দেব, কুমুদ রঞ্জন দাস, সুনীল সরকার, তারানি দেবনাথ, সচীন্দ্র চন্দ্র পাল, বীরেন্দ্র সূত্রধর, সুকুমার পুরকায়স্থ ও কমলা ভট্টাচার্য্য। এদের আÍাহুতির পরপরই আসাম সরকার বাংলাকে রাজ্যের স্বীকৃতি প্রদানে বাধ্য হয়।
আর এভাবেই ১৯৬১ সালের ১৯ মে তারিখটি আসাম রাজ্যে রক্তøাত ‘বাংলা ভাষা দিবস’ হিসেবেই পরিগণিত। একইভাবে শিলচর রেলওয়ে স্টেশনে শহিদের নামসম্বলিত একটি ভাষা সৌধ নির্মাণসহ সেটির নামকরণ করা হয় ‘ভাষা শহিদ স্টেশন’।