বেড়েই চলেছে কিডনির অবৈধ ব্যবসা

Kidney-400x266রাশেদ শাওন : অভাব, দারিদ্র্য আর ঋণের ভারে জর্জরিত হয়ে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকার অনেকেই বিক্রি করে দিচ্ছে তাদের কিডনি। অবৈধ পাসপোর্ট নিয়ে ভারতে গিয়ে হচ্ছে এসব কাজ।

কালোবাজারে নিজেদের কিডনি বিক্রি করা অনেকেই আবার দালাল হিসেবে কাজ করছে অবৈধ এ ব্যবসায়ের। স্বাস্থ্যের প্রতি অসচেতন হয়ে শরীরের এ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বিক্রি করে অনেকেই পরবর্তীতে শিকার হচ্ছেন বড় ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যার।

এমন একজন ভুক্তভোগী হলেন জয়পুরহাট জেলার কালাই উপজেলার নারী রওশন আরা। তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মতো কালোবাজারে কিডনি বিক্রি করে দেয় ২৮ বছর বয়সী এ নারী।

কিডনি বিক্রিতে সহায়তাকারী দালালের নাম না জানিয়ে রওশন আরা জানায়, এর আগে তার দেবর কিডনি বিক্রি করে নানা জটিলতার সম্মুখীন হওয়ায় তাকে এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছিলো।

সে বলে, ‘কিন্তু আমি প্রচণ্ড রকমের দারিদ্র্যের শিকার ছিলাম। আমার স্বামী স্থায়ীভাবে অসুস্থ। আমার মেয়ের শিক্ষার খরচ বহন করা কঠিন। আমি ঢাকাতে কাজের সন্ধানে গিয়েছিলাম কিন্তু বেতন খুব কম। ’

পুলিশ জানায়, কমিশনের বিনিময়ে কিডনিদাতা জোগাড় করে দালালরা। স্থানীয় পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, ‘চলতি বছরেই কালাই থেকে ৪০ টি কিডনি বিক্রি করা হয়। ২০০৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত ২০০ গ্রামবাসী কিডনি বিক্রি করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যারা কিডনি বিক্রি করেছে তারা সবাই পরবর্তীতে দালাল হিসেবে কাজ শুরু করে এবং এ ব্যবসায় নেটওয়ার্কের একটি অংশ হয়ে যায়। তারা প্রথমে টার্গেট করে তাদের পরিবার তারপর আত্মীয় স্বজন এবং শেষে গ্রামবাসী।’

প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২ হাজার লোক অবৈধভাবে কিডনি বিক্রি করে। এর আগে ২০১১ সালে পুলিশ জানায়, ভারতের বিভিন্ন চিকিৎসক, নার্স এবং ক্লিনিক এ অবৈধ কাজে জড়িত।

কিডনি বিশেষজ্ঞ মুস্তাফিজুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, ‘অবৈধ ব্যবসায়ীদের পক্ষে অনেক প্রভাবশালী লোক রয়েছে। অবৈধভাবে কিডনি ব্যবসায়ে তারা সহজেই অবৈধ পাসপোর্ট ও পরিচয় পত্র তৈরী করতে পারে।’

রওশন আরা বলে, ‘তারা অবৈধ পাসপোর্টে আমার নাম দিয়েছিলো নিশি আকতার। অপারেশনের দিন আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম। আমি বার বার আল্লাহর নাম নিচ্ছিলাম।’

কিডনির মূল্য হিসেবে রওশন আরাকে দেওয়া হয় ৪ হাজার ৫০০ ডলার (প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা)। এ টাকা দিয়ে সে কৃষি ভূমি লিজ নিয়ে সেখানে আলু ও চাল উৎপাদন করে। তার ১৩ বছরের একমাত্র মেয়ে ডাক্তার হতে চায়। তার জন্যও সে প্রাইভেট টিউটরের ব্যবস্থা করেছে।

তবে রওশন আর আগের মতো শক্তিশালী নেই। সামন্যতেই সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয় তার।

কিডনি বিক্রি করে নিজের ভুল বুঝতে পেরে সে বলে, ‘কিডনি বিক্রি করা আমার একটা বড় ভুল ছিল। এখন আমার সুস্থ থাকতে অনেক টাকার ওষুধ খেতে হয়।’

এ বিষয় নিয়ে কাজ করা মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মরিুজ্জামান মনির বলেন, ‘একজন দালাল সহজেই সম্ভাব্য একজন বিক্রেতাকে রাজি করাতে পারে। কারণ কিডনি বিক্রি করা ছাড়া তার আর কিছুই করার থাকে না।’

এর আগে গত মাসে একজন মূলহোতাসহ ১২ অবৈধ কিডনি ব্যবসায়ী চক্রের ১২ জনের একটি দলকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

সূত্র : এএফপি।